লিড নিউজ

যুক্তরাষ্ট্রের কমিশনের প্রতিবেদন: সংস্কারে অগ্রগতি হলেও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে দেশে উদ্বেগ রয়ে গেছে

  • 6:54 pm - July 26, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১১৯ বার
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ); গ্রাফিক্স ছবিঃ ওটিএন বাংলা

মেলবোর্ন, ২৬ জুলাই-বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধনে অগ্রগতি অর্জন করলেও ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)। গত ২১ জুলাই প্রকাশিত এক বিশদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা সূচিত হয় এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ওই বছরের আগস্টে সেনাবাহিনীর সমর্থনে এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে সরকার বেশ কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তন, আইন সংস্কার ও প্রস্তাব উত্থাপন করে। তবে এর মধ্যেও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। যদিও আওয়ামী লীগকে তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তথাপি শেখ হাসিনার শাসনামলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে, বিএনপির সঙ্গে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক থাকার বিষয়টি তুলে ধরে কমিশন বলেছে, বিএনপি অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল।

চলতি বছরের মে মাসে ইউএসসিআইআরএফ-এর একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। প্রতিনিধি দল তাদের পর্যবেক্ষণে জানায়, যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন, তারপরও অনেকেই নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাস নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা বিশ্বাস করে, নিজের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকলেও দণ্ডবিধির ১৯৫এ ধারায় ধর্ম অবমাননার আইন বজায় রয়েছে, এবং ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন কনটেন্ট শেয়ার করাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড।

প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার সম্পর্কেও প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। নতুন সংস্কার প্রস্তাবে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দের পরিবর্তে ‘বহুত্ববাদ’ ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএনপি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যটি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) বিকল্প হিসেবে ‘বহুসংস্কৃতিবাদ’ শব্দ ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।

ইউএসসিআইআরএফ বলছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় সরকার নিন্দা জানালেও সেগুলোর বিচার ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। কমিশন আংশিকভাবে এর জন্য দেশের দুর্বল আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থাকে দায়ী করেছে।

সংখ্যালঘুরা অভিযোগ করেছেন, তারা সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত এবং রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত। নারী সংস্কার কমিশন নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে ৪৩৩টি সুপারিশ দিলেও হেফাজতে ইসলামসহ কিছু কট্টর ইসলামপন্থী সংগঠন এগুলোকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ করেছে। কমিশনের অন্যতম প্রস্তাব ছিল ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের বিকল্প হিসেবে একটি সিভিল কোড চালু করা, যা দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

এরপর মে মাসে হেফাজতে ইসলাম প্রায় ২০ হাজার সমর্থক নিয়ে ঢাকায় এক মহাসমাবেশ করে, যেখানে তারা নারী সংস্কার কমিশন বাতিল, সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে রক্ষণশীল ইসলামপন্থী মতাদর্শের প্রভাব বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। কিছু নারী শিক্ষার্থী বলছেন, তারা কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীর বৈষম্য এবং চাপের মধ্যে পড়েছেন।

হিন্দু, আদিবাসী, আহমদিয়া ও সুফি সম্প্রদায়ের সদস্যরা এখনো সামাজিক ও ধর্মীয় বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে কমিশন উল্লেখ করেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচ্ছিন্নভাবে হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ধর্মীয় উত্তেজনা এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধমূলক কৌশল উপস্থাপন করেনি, বরং শুধু অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

সবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের এই কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, সব ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেন নিজের ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে ও ভয়ের বাইরে থেকে পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের অবশ্যই কার্যকর ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এই শাখার আরও খবর

ইয়েমেনে ভয়াবহ সংঘর্ষ, একদিনেই নিহত ১৪১

ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ১৪১ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। শনিবার দুপুর থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত কয়েকটি…

সন্তানকে সম্পত্তি দানের পরও বাবা-মায়ের অধিকার, সংসদে বিল পাস

সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখলে রাখার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে…

বিতর্কিত ১০০ কোটি ডলারের এলএনজি চুক্তি, বড় ধরণের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উচ্চ ব্যয়ের একটি নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক…

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলতে পারে: সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত আরও অন্তত ছয় মাস চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা।…

রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা

রাষ্ট্র-মালিকানাধীন দেশের ছয়টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে। গত ৩০…

কোণঠাসা বিজেপি কি ফের কট্টর হিন্দুত্বের পথে?

টানা আড়াই দশক ধরে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নানা কারণে এখন কিছুটা চাপে। এই পরিস্থিতিতে দলটি আবারও কট্টর হিন্দুত্বের রাজনীতির…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au