গোপালগঞ্জে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার পর সেনাবাহিনী: সংগৃহীত ছবি
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই- গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাকে ঘিরে পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করেছে ১১ জন বিশিষ্ট নাগরিকের একটি পর্যবেক্ষণ দল। তাঁরা জানান, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কোনও যুক্তিসংগত প্রমাণ তাঁরা পাননি। সেই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
সহিংসতার প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই, গোপালগঞ্জ শহরে এনসিপির আয়োজিত একটি রাজনৈতিক সমাবেশ ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সমাবেশ শুরুর আগেই হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়ি ভাঙচুর এবং গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। পরে শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন এবং হাজারো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২২ জুলাই গোপালগঞ্জ সফর করেন ১১ জন নাগরিক, যাঁদের মধ্যে ছিলেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা, মোশাহিদা সুলতানা, রুশাদ ফরিদী, আইনজীবী সারা হোসেন, মানজুর আল মতিন, সাংবাদিক তাসনিম খলিল, লেখক ফিরোজ আহমেদ, শিল্পী বীথি ঘোষ এবং মানবাধিকারকর্মী নাফিউল আলম। তাঁদের সঙ্গে আরও একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাংবাদিকও ছিলেন।
পরিদর্শনের ভিত্তিতে আজ শনিবার তাঁরা গণমাধ্যমে লিখিত বিবৃতি পাঠিয়ে তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ প্রকাশ করেন।
আগে থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা
পর্যবেক্ষক দল জানায়, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার আগে থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও এনসিপির কর্মী-সমর্থকদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনাকর বক্তব্য, হুমকি ও উসকানিমূলক ভিডিও ছড়ানো হয়। গোপালগঞ্জবাসী এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এনসিপির পক্ষ থেকেও উসকানিমূলক বক্তব্যের যথেষ্ট উপস্থিতি ছিল। বিশেষত, টুঙ্গিপাড়া নিয়ে একাধিক ইউটিউবারের হুমকি, এনসিপি নেতাদের হাতুড়ি ও ভেকু ভাড়ার প্রসঙ্গ এবং ‘টুঙ্গিপাড়ার কবর ভাঙার’ হুমকির মতো মন্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
তবে এনসিপি ছাত্র ও সমর্থকদের মতে, ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচির নামকরণে কোনো প্ররোচনার উদ্দেশ্য ছিল না। তবুও পর্যবেক্ষক দল মনে করে, এনসিপির পক্ষ থেকে উত্তেজনা প্রশমনে স্থানীয় মানুষকে আশ্বস্ত করার কোনও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সহিংসতার দিন
বিবৃতিতে বলা হয়, সমাবেশ শুরুর আগেই একদল হামলাকারী সমাবেশের মঞ্চ ভাঙচুর করে। কোটালীপাড়া রাস্তায় সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। শহরের প্রবেশপথগুলোতে গাছ ফেলে বাধা দেওয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, এসব ঘটনা একটি সংগঠিত হামলার ইঙ্গিত দেয়।
সমাবেশস্থলে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়ার কারণে হাজার হাজার উত্তেজিত মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। সমাবেশ শেষে এনসিপি নেতারা যখন এলাকা ছাড়ছিলেন, তখন শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় তাঁদের গাড়িবহরে হামলা হয়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বারবার পিছু হটতে হয়, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় পাশের জেলা থেকে রসদ এনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
পরে এনসিপি নেতাদের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখানে আবারও ঘেরাওয়ের মুখে পড়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরপরই সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গুলিবর্ষণ করেন, যা হামলাকারী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
প্রাণহানি ও বলপ্রয়োগ
পর্যবেক্ষক দলের তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে দীপ্ত সাহা গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে নিরস্ত্র অবস্থায় স্লোগান দিচ্ছিলেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক ইমন ঊরুতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান—যা অস্বাভাবিক ও তদন্তসাপেক্ষ। রমজান কাজী দৌড়ানোর সময় পড়ে গেলে তাঁকে প্রথমে মারধর ও পরে গুলি করা হয় বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
তাঁরা বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনতার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের দাবি যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি। বরং দেশীয় অস্ত্র ও ককটেল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে।
এনসিপি নেতাদের মতে, প্রশাসন যদি পরিস্থিতির যথার্থতা তাঁদের সামনে তুলে ধরত, তাহলে তাঁরা সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারতেন। তাঁরা যে রুটে চলেছেন, তাও পুলিশের পরামর্শেই নির্ধারিত ছিল।
ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ ও উদ্বেগ
ঘটনার পর গোপালগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয় এবং ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। পুলিশের তথ্যমতে প্রায় ৩০০ জন গ্রেপ্তার এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সন্ত্রাস দমন আইনে শিশুদের গ্রেপ্তার এবং যশোর শিশু সংশোধনাগারে পাঠানোর ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন পর্যবেক্ষকরা।
তদন্ত কমিশন নিয়ে প্রশ্ন
সরকার যে তদন্ত কমিশন গঠন করেছে, তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে পর্যবেক্ষণ দল। কমিশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি রয়েছেন—যাঁদের বিরুদ্ধেই বলপ্রয়োগের অভিযোগ আছে। সেই সঙ্গে কমিশনের কার্যপরিধিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা তদন্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পর্যবেক্ষণ দলের সুপারিশসমূহ। ছবিঃ সংগৃহীত
পর্যবেক্ষণ দলের সুপারিশসমূহ
১. এনসিপির সমাবেশে হামলার ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা।
২. উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার থেকে বিরত থাকা—সব রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রযোজ্য।
৩. গণগ্রেপ্তার, আটক ও মামলা পরিচালনায় আইন অনুযায়ী শিশুসহ সবার নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা।
৪. প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা।
৫. বলপ্রয়োগে অভিযুক্ত সংস্থাগুলিকে বাদ দিয়ে তদন্ত কমিশন পুনর্গঠন করা।
৬. গুজব ও প্ররোচনামূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ, যাতে কোনো সম্প্রদায় বা অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
৭. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আইন সংশোধন করে পুনর্গঠন এবং কার্যকর করা।
৮. সব নাগরিকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে কেউ হয়রানির শিকার না হন, বিশেষ করে শিশুদের অধিকার রক্ষা করা।
পর্যবেক্ষণ দলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গোপালগঞ্জের ঘটনা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সংকট নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা ও মানবাধিকার রক্ষার একটি বড় পরীক্ষা। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এটি কেবল গোপালগঞ্জ নয়, গোটা দেশের জন্যই একটি সতর্কবা