অন্তত ১৯টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই- বাংলাদেশের উত্তরের জেলা রংপুরের গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি ইউনিয়নের আলদাদপুর গ্রামে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত হিন্দু শিক্ষার্থী রনজন রায়কে মারধর করে স্থানীয়রা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এ ঘটনায় আলদাদপুর গ্রামে শনিবার(২৬ জুলাই) রাতে ও পরদিন রবিবার(২৭ জুলাই) দুপুরে অন্তত ১৯টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ওই এলাকায় এখনও (স্থানীয় সময় রবিবার রাত ১১ টা) উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়ন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে, যেখানে মুসলমানদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করা হয়। পোস্টটি ‘রনজন রায়’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া হয়। তবে পরিবারের দাবি, এটি রনজনের প্রকৃত আইডি নয়। তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া একটি আইডি খুলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই পোস্ট দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, এটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ভুয়া আইডির মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানি ছড়ানো হচ্ছে, যাতে করে তাদের গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা যায়।
অভিযুক্ত রনজন রায়(২০) রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগড়ি ইউনিয়নের আলদাদপুর ছয়ানি গ্রামের বাসিন্দা সুজন কুমার রায়ের ছেলে এবং রংপুর রিট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর শিক্ষার্থী।
শনিবার(২৬ জুলাই) অসমর্থিত সূত্র থেকে ঐ বিতর্কিত পোস্টটিকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বলে অভিযোগ করা হয়। এরপর ওইদিন রাতেই কিছু মুসলিম জনতা রনজন রায়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর করে এবং তার বাড়ি ও তার প্রতিবেশী কাকা মনোজ কুমার রায়ের বাড়ি ভাঙচুর করে। ভাংচুরে অংশ নেয়া উপস্থিত লোকজন রনজন রায়কে মারধরের পর পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
অভিযুক্ত গ্রেফতারের পর আরও হামলা
শনিবার রাতে রনজন রায় ও তাদের প্রতিবেশীর বাড়িতে হামলার খবর প্রচার হতে শুরু করলে পুরো গ্রামে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এরপর দিন রবিবার (২৭ জুলাই) সকালে ওই গ্রামের পাশের বাজারে অভিযুক্ত রনজনের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে স্থানীয় তৌহিদি জনতা।ওটিএন বাংলার হাতে আসা ভিডিওতে দেখা যায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়া কিছু বিক্ষোভকারী হাতে লাঠি নিয়ে মিছিল করছেন।
এর কিছুক্ষণ পর বিক্ষোভে অংশ নেয়া বিক্ষোভকারীরা অভিযুক্ত রনজন রায়ের গ্রামে ঢুকে পরে এবং এলোপাতাড়ি বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এতে মোট ১৯ টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল এমরান। হামলা ঠেকাতে গিয়ে একজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য জানান, তাদের বাড়ির ১টি গরুসহ মোট ৫ টি গরু লুট করা হয়েছে। প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী এই ভাঙচুর তাণ্ডবে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের মা বোনদের সম্মান বাঁচাতে ওদের নিরাপদে রাখতে গিয়েছিলাম। এসে দেখি বিল্ডিং ঘরগুলো ছাড়া ভাঙার কিছু বাকী নাই। যার যেটা ভালো লাগছে সে সেটা নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কিচ্ছু করার ছিল না। অনেকে তো কাছেই আসতে পারেনি, দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের বাড়ি ভাঙচুর দেখেছে।‘ সাক্ষাৎকার পরবর্তী ঝুঁকি এড়াতে পরিচয় প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান এই ভুক্তভোগী।
রনজন রায়ের এক বন্ধু বলেন, যতদিন থেকে তাকে চিনি তার পক্ষে এমন পোস্ট দেয়া সম্ভব নয়। আর সে এমন মানুষই যা যে এগুলো বিষয় নিয়ে পোস্ট দিবে। এই ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার।
রবিবার (২৭ জুলাই) কিশোর অভিযুক্ত রনজন রায়কে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রংপুর আদালতে তোলা হয়। আদালত তাকে জামিন না দিয়ে শিশু পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই গ্রামে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন হিন্দু পরিবারগুলো। নারী ও শিশুদের নিয়ে ঘরবাড়ি ভাংচুরের শিকার পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে মুখ খুলছেন না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটে মোট ১৯ টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ছবিঃ ওটিএন বাংলা
গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আল এমরান বলেন, ‘ওই কিশোর সামাজিক মাধ্যমে ধর্ম অবমাননাকর লেখা ও ছবি দিয়েছে- এমন অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাৎক্ষণিক তাকে আটক করে থানায় আনা হয়। পরে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে রোববার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাকে শিশু পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়।’
গঙ্গাচড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এখন সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত আছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’ ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে বলে জানান তিনি।
*ছবি ও ভিডিওঃ ওটিএন বাংলা ভেরিফাইড