ফিফার রেকর্ডে নেই লাল কার্ড, তবু পারেদেসের বিরুদ্ধে তদন্তে শাস্তির আশঙ্কা
মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: স্পেনের কাছে ১-০ গোলে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর ম্যাচ শেষে মাঠে ঘটে যাওয়া উত্তপ্ত সংঘর্ষের জেরে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়েন্দ্রো পারেদেসকে লাল কার্ড…
মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই- বাংলাদেশের উত্তরের জেলা রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি হিন্দু গ্রামের প্রায় ২০ টি বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করার পর এখন পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়ার সাহস পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। নিরাপত্তার অভাবে বাড়ির অবশিষ্ট মালামাল নিয়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
গত শনিবার (২৬ জুলাই) রাতে ও রবিবার (২৭ জুলাই) বিকেলে মোট ২ দফায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনার পর ২৮ জুলাই(সোমবার) বিবিসি বাংলাসহ দেশটির বেশকিছু গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করলেও দেশটির অধিকাংশ গণমাধ্যমগুলো এ নিয়ে কোন সংবাদ প্রকাশ করেনি। বিষয়টি নিয়ে দেশটির বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেরও নীরব ভূমিকা দেখা গেছে। সরকারে থাকা কোন উপদেষ্টাকে এনিয়ে কোন মন্তব্য করতে শোনা যায়নি। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংও এনিয়ে কোন তথ্য জানায়নি। দেশটির কিছু সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলা ও লুটপাটের নিন্দা জানিয়েছেন।
বর্তমানে ঐ এলাকায় সেনা মোতায়ন করা হয়েছে এবং নতুন করে হামলার শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।সর্বশেষ পাওয়া তথ্য (স্থানীয় সময় ২৮ জুন রাত ১১ টা) অনুযায়ী হামলার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে মামলা হলেও প্রকৃত অপরাধীরা গ্রেপ্তার হবেন কিনা সেই আশঙ্ক করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

ঘটনার পর গ্রাম ছেড়ে অনেকেই মালামাল নিয়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছেন। ছবিঃ প্রথম আলো
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়-
‘রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নে নবী মুহাম্মদ (স.)-কে নিয়ে ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, পাশের উপজেলার একটি গোষ্ঠী মাইকিং করে মিছিল নিয়ে এসে এসব হামলা চালায়।
অভিযুক্ত কিশোর একজন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ তাকে আটক করে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান খান জানান, শনিবার রাতেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে এবং কিশোরকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপরও রোববার দুপুরে প্রায় দুই-তিন হাজার মানুষ ওই এলাকায় এসে অন্তত ১৫টি বাড়িঘর ভাঙচুর করে। এ সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
প্রশাসনের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক।
তবে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলছেন, যাকে নিয়ে অভিযোগ, সে নিজে কোনো অবমাননাকর পোস্ট দেয়নি। ফেসবুকে যে পেইজ থেকে পোস্ট করা হয়েছে তা ভেরিফায়েড নয়। নিরাপত্তার স্বার্থে পরিবারের লোকজনই কিশোরটিকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু এরপরও লোকজন এসে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। শুধু বসতবাড়ি নয়, আশপাশের আখক্ষেতও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও এ ঘটনাকে উস্কানিমূলক বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও একদল লোক পরিকল্পিতভাবে এলাকায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে। সেনাবাহিনী উপস্থিত হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বর্তমানে এলাকাজুড়ে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। তবে সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত এবং প্রায় আড়াই হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছে। তাই এমন হামলার ঘটনায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। প্রশাসন বলছে, হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধানসহ বাড়ির মালপত্র ভ্যানে বা মাথায় করে সরিয়ে নিচ্ছেন পরিবারগুলো; ছবিঃ প্রথম আলো
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়-
‘রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলদাদপুর ছয়ানি গ্রামে ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি পরিবার হামলা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। বর্তমানে পুরো গ্রামে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য মালামাল ভ্যানে করে সরিয়ে নিচ্ছে।
ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্টের অভিযোগে শনিবার রাতে এক কিশোরকে (রনজন রায়) আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে তাকে আদালতের মাধ্যমে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তবে রনজনের পরিবারের দাবি, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নামে খুলে চালানো একটি ভুয়া আইডি।
কিশোরকে থানায় নেওয়ার পর উত্তেজিত জনতা শনিবার রাতে দুটি মিছিল নিয়ে তার বাড়ি ও স্বজনদের বাড়িতে হামলা চালায়। এরপর রোববার বিকেলে আবারো হামলা হয়। হামলায় অন্তত ১৪টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার, পোশাক ও জমির দলিলপত্র লুট করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রবীন্দ্রনাথ রায় নামের এক বাসিন্দা বলেন, তাঁর স্ত্রীর এক ভরি স্বর্ণ, কাপড় ও জমির কাগজ লুট হয়েছে। তাঁর স্ত্রী রোহেলা রানী বলেন, “যদি আবার আগুন দেয়, তবে আর কিছু থাকবে না।”
কমলাকান্ত রায় নামের আরেক বাসিন্দা জানান, তাঁরা রাতে ঘুমাতে পারেননি। সকালে বাড়ির ধান বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আতঙ্কে বাড়িঘর ফাঁকা করে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন।
অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আলদাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কালী রঞ্জন রায় জানিয়েছেন, প্রায় সব শিক্ষার্থী সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় কেউ স্কুলে আসেনি।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গ্রামে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গঙ্গাচড়া থানার ওসি আল এমরান জানিয়েছেন, হামলার সময় বাধা দিতে গিয়ে পুলিশের এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন, তবে এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। এখনও পর্যন্ত হামলার ঘটনায় কেউ আটক হয়নি এবং কোনো মামলা হয়নি।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি পরিবারের তালিকা করা হয়েছে, এবং তাদের আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান, হামলায় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার কিছু লোক জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। যাতে করে তারা পুনরায় আক্রমণ করতে না পারে, সে জন্য খিলালগঞ্জ বাজার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ঘটনার পর গ্রামজুড়ে উদ্বেগ, ভীতির পাশাপাশি বারবার হুমকি পাওয়ায় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।’
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au