একটি ধর্মীয় স্কুলে আফগান মেয়েরা। ছবি: সিএনএন
মেলবোর্ন, ৫ আগষ্ট- “আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম,” গলা নিচু করে বলল আফগান এক কিশোরী। কিন্তু কথার মাঝেই পাশে বসা আরেক সহপাঠী চুপ করিয়ে দিল তাকে, যেন মনে করিয়ে দিল- তালেবান শাসনে সত্য উচ্চারণ করাও বিপজ্জনক।
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের প্রান্তে অবস্থিত এক তালেবান অনুমোদিত নারীদের মাদ্রাসা নাজি-এ-বসরা-তে বসে বলা এই কথাটি শুধু একটি কিশোরীর নয়, বরং আজকের আফগান সমাজে লক্ষ নারীর অজস্র স্বপ্নের ভাঙা প্রতিধ্বনি। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে দেশটিতে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ। এটি বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের সাধারণ শিক্ষায় বাধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মেয়েদের ‘শিক্ষা’ মানেই এখন ধর্মীয় মাদ্রাসা।
মাদ্রাসার ভেতরে শিক্ষার নামে সীমাবদ্ধতা
তালেবানের অনুমোদিত মাদ্রাসাগুলোর সংখ্যা এখন প্রায় ২৩ হাজার। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামি জ্ঞান, যেমন কোরআন, হাদিস ও শরিয়া আইন শেখানো হয়। সরকারি মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার বাইরের কিছু শেখানো নিষিদ্ধ। নাজি-এ-বসরার মতো বেসরকারি কিছু মাদ্রাসায় সামান্য বিজ্ঞান বা ভাষা শেখানো হলেও তা অত্যন্ত সীমিত এবং অভিভাবকদের নিজস্ব তহবিলেই পরিচালিত।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে দেশটিতে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ। ছবিঃ রয়টার্স
২০২২ সালে তালেবানের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এক ভাষণে বলেন, মেয়েরা ভালোভাবে হিজাব পরে না, যেন বিয়েতে যাচ্ছে! তাঁর দাবি, কৃষি বা প্রকৌশল পড়া ইসলাম ও আফগান সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। ইউনেসকোর হিসাব বলছে, ২০২১ সালের পর থেকে ১৫ লাখের বেশি মেয়ে তাদের শিক্ষা হারিয়েছে।
আলো আঁধারে গড়ে ওঠা গোপন পাঠশালা
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু সাহসী কণ্ঠ প্রতিরোধের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। তেমনই একজন নারগিস। বয়স মাত্র ২৩। একসময় অর্থনীতি পড়তেন, ইংরেজি শেখার পাশাপাশি একটি পার্টটাইম চাকরিও করতেন। কিন্তু তালেবান আসার পর সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। তবু হার মানেননি নারগিস। শুরু করেন নিজের ছোট বোনদের পড়ানো, পরে যোগ দেয় প্রতিবেশী ও আত্মীয়ের মেয়েরা। এখন প্রতিদিন সকাল ৬টায় ৪৫ জন কিশোরী তাঁর বাড়িতে আসে গোপনে পড়তে।
অথচ এই সাহসের মূল্য নারগিসকে দিতে হয়েছে। দুই মাস আগে তালেবান তাঁর বাড়িতে হানা দেয়। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে এক রাত কাটান হাজতে। পরিবার তাঁকে থামাতে চাইলেও তিনি স্থান বদলে আবার চালু করেছেন গোপন পাঠশালা।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবু আশা অটুট
এই গোপন স্কুলগুলোর একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস-এইডের মাধ্যমে চলছিল। কিন্তু অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকগুলো স্কুলও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারগিস নিজেও একটি স্কলারশিপে ব্যাচেলর ডিগ্রি করছিলেন, সেটিও এখন থমকে গেছে।

আফগান নারীদের জোরে কথা বলা ও অন্য পুরুষের দিকে তাকানো নিষিদ্ধ। ছবিঃ রয়টার্স
তবুও নারগিস থেমে যাননি। একদিন হয়তো তার গলা বুজে আসে, হতাশা ছুঁয়ে যায়, তবু সে প্রশ্ন করে — “আমার মা কোনোদিন স্কুলে যাননি। আমিও আজ ঘরে বন্দি। তাহলে আমরা এত পড়ালেখা করছি কিসের জন্য? কী ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে?”
‘মা’ হওয়ার শিক্ষার নামে ভবিষ্যৎ ধ্বংস
তালেবান বলছে, তাদের মাদ্রাসার শিক্ষা মেয়েদের ‘মায়ের’ ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করছে। কিন্তু নারগিস ও তাঁর মতো হাজারো মেয়ের বিশ্বাস, এ কোনো প্রস্তুতি নয়, বরং এক নিষ্ঠুর স্বপ্নহত্যা। তাঁরা চান সেই শিক্ষা, যা জীবন বদলায়, ভবিষ্যৎ গড়ে।
এখনো অনেক মেয়ে গোপনে শিখছে, জানছে, প্রতিরোধ করছে—তালেবান যে ভবিষ্যৎ কুড়ে নিতে চায়, তা একদিন হয়তো নারগিসদের হাত ধরেই ফিরবে নতুন আলোয়।
সুত্রঃ সিএনএন