‘মব’ সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ আগষ্ট- ‘মব’ সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, সরকার, মালিকপক্ষ ও সম্পাদকের বাইরেও এক ধরনের সামাজিক শক্তি গড়ে উঠেছে, যারা সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। গণমাধ্যম এখন এই সামাজিক চাপে রয়েছে—এটা সবার বিবেচনায় আনা দরকার।
বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: অভিযোগ নিষ্পত্তি ও স্ব-নিয়ন্ত্রণের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের সময় নানা নতুন সামাজিক শক্তি আবির্ভূত হয়, যারা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও এর কিছু প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, যদিও তুলনামূলকভাবে তা এখনও ভয়াবহ রূপ নেয়নি।
তিনি সাংবাদিক সমাজের ভেতরকার বিভক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সংগঠনগুলো এখন এমনভাবে দলীয় বিভাজনে নিমজ্জিত, যেখানে একটি সম্পাদক পরিষদের পাল্টা আরেকটি পরিষদ গঠিত হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এই বিভক্তির জাল থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতা যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা গত ৫৪ বছর ধরেই কোনো না কোনোভাবে চলছে। শুধু সরকার বদলায়, আমরাও বদলাই। তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা দৌড়ের ওপরে আছেন। কেউ মামলা খাচ্ছেন, কেউ দেশ ছাড়ছেন, কেউ চাকরি হারাচ্ছেন—এই বাস্তবতায় কীভাবে বলি সাংবাদিকতা মুক্ত?”
তিনি উল্লেখ করেন, আজ সাংবাদিকতা পক্ষে থাকলে ‘মুক্ত’, বিপক্ষে গেলেই ‘মব ভায়োলেন্স’-এর শিকার। মতিউর রহমান বলেন, আইন করে কাউকে দায়িত্বশীল করা যায় না। দায়িত্ববোধ আসতে হয় ভেতর থেকে। সাংবাদিকতার ওপর চাপ সব দেশেই থাকে, তবে আমরা নিজেরাই রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য সেই চাপের অংশ হয়ে উঠছি।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম এখন অন্তঃসারশূন্য। সাংবাদিকদের চাকরি চলে গেলে মালিকপক্ষ অনেক সময় বছরের পর বছর বকেয়া বেতনও পরিশোধ করে না। তিনি এজন্য পৃথক একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান।
তিনি বলেন, “বিএফইউজে-ডিইউজে এখন মাফিয়াতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলগুলো সাংবাদিকদের ভেতর থেকে কাউকে প্রেস মিনিস্টার বানায়। গত ১৬ বছর ধরে দেখছি গণভবন কেন্দ্রিক তাদের কর্মকাণ্ড। ভালো বেতন-ভাতা নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, তাহলে কীভাবে ভালো সাংবাদিকতা আশা করা যায়?”
তিনি আরও বলেন, “সন্তোষ গুপ্ত, এবিএম মূসা, আতাউস সামাদের মতো সাংবাদিক আর তৈরি হচ্ছে না। প্লট ও বিদেশ ভ্রমণের লোভে সাংবাদিকতা যেন না চলে।” তিনি বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “১৯৯১ সালে সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিন মাসে যা করেছিল, এখনকার সরকার তা ১২ মাসেও করতে পারছে না।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর (পাভেল), সদস্য মাহমুদা হাবিবা, মাছরাঙা টেলিভিশনের এডিটর-ইন-চিফ রেজওয়ানুল হক রাজা, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক আসিফ বিন আলী, বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান, ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কাজী জেসিন প্রমুখ।