সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- গাজা ভূখণ্ড পুরোপুরি দখলের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর মনোভাবের মুখে তারই দেশের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, গাজার পূর্ণ দখলের পরিকল্পনা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য “একটি ফাঁদ” এবং এটি বাস্তবায়িত হলে দেশ ভয়াবহ বিপদে পড়তে পারে।
নেতানিয়াহু বনাম সেনাপ্রধান: দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজা ইস্যুতে শুধু অভ্যন্তরীণ নীতিগত মতবিরোধ নয়, এই দ্বন্দ্ব এখন ব্যক্তিগত আক্রমণেও রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন, যেখানে তিনি সেনাপ্রধান জামিরের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ ও সামরিক অভ্যুত্থানের’ ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন।
ইয়ার নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান সেনাপ্রধান। তিনি অভিযোগটি ভিত্তিহীন ও সম্মানহানিকর উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কিন্তু জামিরের এই প্রতিক্রিয়াকে নেতানিয়াহু ভালোভাবে নেননি। বরং তিনি সেনাপ্রধানকে কটাক্ষ করে বলেন, “পরিকল্পনা পছন্দ না হলেই পদত্যাগের হুমকি দেন — এটা বারবার মেনে নেওয়া যায় না।”
যদিও ইয়ার নেতানিয়াহু ইসরায়েল সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে নেই, তবুও তিনি বিভিন্ন সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অতি সক্রিয় হয়ে মতপ্রকাশ করেন এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন, যার প্রভাব পড়ে সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে।
যুদ্ধ ও দখল পরিকল্পনায় ভিন্নমত
গাজার বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের ব্যাপ্তি ও পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার ভেতরেও মতবিরোধ রয়েছে। সম্প্রতি যুদ্ধের পরিধি বাড়ানো নিয়ে মন্ত্রিসভার সঙ্গে সেনাপ্রধান জামিরের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে।
নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যদি সেনাপ্রধান গাজার পূর্ণ দখলের পরিকল্পনায় রাজি না হন, তাহলে তাকে পদত্যাগ করতে হতে পারে। তবে ইয়াল জামির বরাবরই এই দখল পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছেন। তার মতে, গাজায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে ইসরায়েলি সেনারা বহুদিন সেখানে আটকে যাবে, এতে কেবল সেনাবাহিনীর ঝুঁকি বাড়বে না, বরং জিম্মিদের জীবনহানির সম্ভাবনাও প্রবল।
সেনাবাহিনীর উদ্বেগ
সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, গাজা পুরোপুরি দখল করতে গেলে ইসরায়েলকে কয়েক মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী লড়াই চালাতে হবে এবং এতে অসংখ্য ইসরায়েলি সেনা হতাহত হতে পারেন। এ ছাড়া হামাসের হাত থেকে যেসব ইসরায়েলি নাগরিক এখনও জিম্মি, তাদের জীবনও হুমকির মুখে পড়বে।
তারা মনে করেন, গাজা শাসনব্যবস্থার কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই সেখানে পূর্ণ সেনা উপস্থিতি তৈরি করা সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় বিবেচনায় মারাত্মক ভুল হবে।
পরিস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই বিরোধ ও উত্তেজনার পটভূমিতে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব সাধারণত বিরল ঘটনা। এতে বোঝা যাচ্ছে, গাজা যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক অভিযান নয় — বরং এটি ইসরায়েলের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন ও সিদ্ধান্তহীনতার বহিঃপ্রকাশও।
নেতানিয়াহুর সরকার যেখানে গাজা দখলকে “নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই” হিসেবে দেখাতে চাইছে, সেখানে সেনাপ্রধান ও একাংশ সামরিক নেতৃত্ব তা দেখছেন একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপদ এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন জুয়া হিসেবে।
ইসরায়েলের গাজা দখলের পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ এখন প্রকাশ্যে। সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরের অবস্থান এই সংকটময় সময়ে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা ইসরায়েলি নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নেয় — যুদ্ধপন্থী কঠোর রাজনৈতিক ইচ্ছার জয় হয়, নাকি বাস্তবতার ভিত্তিতে সামরিক নেতৃত্বের সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায়।
সুত্রঃ টাইমস অব ইসরায়েল