দিনে দুপুরে লুট করা হচ্ছে সিলেটের সাদা পাথর; ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সাদাপাথর লুটপাটে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, কয়েক শ কোটি টাকার পাথর অবৈধভাবে উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অন্তত ৪২ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতা।
দুদকের সিলেট জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক রাফী মো. নাজমুস সাদাতের নেতৃত্বে একটি টিম ১৩ আগস্ট এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে ঢাকায় পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর থেকে পাথর উত্তোলন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। বিশেষ করে গত তিন মাসে নির্বিচারে লুট হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে পর্যটন এলাকা ধ্বংস হয়ে গর্ত ও বালুচরে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে ছয়টি ক্যাটাগরিতে দায় নির্ধারণ করা হয়েছে-খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি), স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, রাজনীতিবিদ ও অন্যান্য প্রভাবশালী।
প্রশাসনের ভূমিকা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভূমি অফিসের কর্মচারীরা প্রতি ট্রাক পাথর থেকে কমিশন নিয়েছেন। ভাগ বণ্টন হতো জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ (বর্তমানে ওএসডি) কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। গত এক বছরে দায়িত্বে থাকা চারজন ইউএনওও (আবিদা সুলতানা, ঊর্মি রায়, আবুল হাছনাত ও আজিজুন্নাহার) কেবল নামমাত্র পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর বিরুদ্ধেও ‘লুটপাটকে প্রশ্রয় দেওয়ার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিলেন, “দেশে অন্যত্র পাথর উত্তোলন হলে সিলেটে কেন হবে না।” এই বক্তব্য লুটকারীদের উৎসাহ জুগিয়েছে।
পুলিশ ও বিজিবির সংশ্লিষ্টতা
প্রতিটি ট্রাক থেকে পুলিশ কমিশন হিসেবে ৫ হাজার টাকা নিত, যার ভাগ যেত এসপি, এএসপি, ওসি ও অন্যান্য সদস্যদের কাছে। নৌকাপ্রতি কমিশন ছিল ৫০০ টাকা। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের আল মাহমুদ আদনানসহ থানার সদস্যরা সরাসরি সহযোগিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাদাপাথরের কাছে থাকা বিজিবি ক্যাম্প থেকেও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজিবি সদস্যরা চুপ থাকায় নির্বিঘ্নে পাথর উত্তোলন হয়েছে।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
প্রতিবেদনে বিএনপির ২১ জন, জামায়াতের ২ জন, এনসিপির ২ জন ও আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ৭ জনসহ মোট ৪২ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর নাম এসেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, মহানগর জামায়াতের আমির ফখরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন, এনসিপির নাজিম উদ্দিন ও আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির স্থগিত সভাপতি সাহাব উদ্দিন। এছাড়া স্থানীয় যুবদল, শ্রমিক দল ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও মাদ্রাসাশিক্ষকসহ মোট ৪২ জনকে দায়ী করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতারা জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই তাঁদের নাম জড়ানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরা ব্যক্তিগত দায় স্বীকার করেননি। বিজিবিও অভিযোগকে মিথ্যা বলেছে।
দুদক বলেছে, সাদাপাথর লুটপাট সর্বদলীয় যোগসাজশের মাধ্যমে হয়েছে। তবে এখনো কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি। বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য নতুন নথি খোলার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।