মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ আগষ্ট- নিউইয়র্কের একটি আপিল আদালতন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ব্যবসায়িক সহযোগীদের বিরুদ্ধে দেওয়া ৫১৫ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় অর্ধ-শত কোটি ডলার) সিভিল ফ্রড জরিমানা বাতিল করেছে। আদালত বলেছে, এই জরিমানার অঙ্ক ছিল “অতিরিক্ত” এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর বিরোধী।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের আপিলেট ডিভিশনের পাঁচ সদস্যের বিচারক প্যানেল প্রায় ১১ মাস ধরে ট্রাম্পের আপিল শুনানি শেষে এই রায় দেয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী অনুযায়ী সরকার কোনো নাগরিককে অতিরিক্ত শাস্তি বা জরিমানা দিতে পারে না।
এই মামলাটি এনেছিলেন নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ট্রাম্প তার আর্থিক নথি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছেন যাতে বীমা কোম্পানি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নিতে পারেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের একটি নিম্ন আদালত ট্রাম্পকে ৩৫৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেয়। সুদ-আসলে সেই জরিমানা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫১৫ মিলিয়ন ডলারে। কিন্তু আপিল আদালত বলেছে, এই অঙ্ক “অতিরিক্ত” এবং সংবিধান-বিরোধী।
আদালতের এই রায়ের পরপরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন, “এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জয়। ভুয়া মামলা বাতিল করে আদালত দেখিয়েছে সাহস। এই সিদ্ধান্ত নিউইয়র্কের ব্যবসাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে।”
তবে আদালত জরিমানা পুরোপুরি বাতিল করলেও বিচারকরা নিম্ন আদালতের রায় নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। নিম্ন আদালত বলেছিল, ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা প্রতারণার মাধ্যমে নিজেদের সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়েছেন। আপিল প্যানেলের একজন রিপাবলিকান মনোনীত বিচারক ডেভিড ফ্রিডম্যান বলেন, লেটিশিয়া জেমস আসলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতেই এই মামলা করেছিলেন।
লেটিশিয়া জেমস অবশ্য হাল ছাড়েননি। তিনি জানিয়েছেন, তারা আপিল কোর্ট অব অ্যাপিলসে যাবেন। বিবৃতিতে বলা হয়, “ইতিহাসে এটি লিপিবদ্ধ থাকা উচিত আবারও একটি আদালত বলেছে প্রেসিডেন্ট আইন ভেঙেছেন। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”
নিম্ন আদালতের বিচারক আর্থার এঙ্গোরন তার রায়ে বলেছিলেন, ট্রাম্প আর্থিক নথিতে যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা দেখে “বিবেক কেঁপে ওঠে।” তিনি লিখেছিলেন, ট্রাম্প কোনো অনুতাপ বা দায় স্বীকার করেননি, বরং সবসময়ই সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়েছেন। তার মতে, “এটি গুরুতর অপরাধ নয়, তবে প্রতারণা স্পষ্ট।”
এই মামলায় ট্রাম্পের দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রকেও জরিমানা করা হয় এবং দুই বছরের জন্য নির্বাহী পদে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ট্রাম্প তখন কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাহী পদে ছিলেন না, কারণ তিনি তখন ২০২৪ সালের পুনঃনির্বাচন প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন। ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন, এটি “নির্বাচনী হস্তক্ষেপ।”
ট্রাম্প শুধু এই মামলা নয়, আরও বহু আইনি জটিলতায় জড়িত। ২০২৩ সালে তিনি যৌন নিপীড়ন ও মানহানির মামলায় দায়ী সাব্যস্ত হন এবং লেখিকা ই. জিন ক্যারলকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। আরেকটি মামলায় সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩.৩ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া তিনি চারটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হন, যার একটি মামলায় তিনি ৩৪টি জাল নথি তৈরির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দণ্ডিত হন।
এদিকে, লেটিশিয়া জেমসকে নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন চাপ বাড়িয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ তাকে সাবপোনা পাঠিয়েছে, যাতে তার এনআরএ (ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন) তদন্তের নথি জমা দিতে হয়। ট্রাম্প দাবি করছেন, জেমস রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে টার্গেট করেছেন এবং এমনকি তাকে “বর্ণবাদী” বলেও অভিহিত করেছেন।
লেটিশিয়া জেমস ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল হন এবং তিনি এই পদে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। জেমস বলেছেন, “আপনি যতই ধনী, প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হোন না কেন, সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য। ট্রাম্প বহু বছর ধরে প্রতারণা করে এসেছেন।”
এখন দেখা যাচ্ছে, আদালত জরিমানা বাতিল করলেও মামলার লড়াই এখানেই শেষ নয়। জেমস আপিল করবেন, আর ট্রাম্পও এটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে তার নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করবেন।
সুত্রঃ আল জাজিরা