নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৫ সেপ্টেম্বর- রাজনীতি এমন এক মঞ্চ, যেখানে নেতারা আসেন, প্রভাব বিস্তার করেন এবং একদিন সরে দাঁড়ান। তবে কিছু নেতা থেকে যান মানুষের স্মৃতিতে, তাঁদের আলাদা নেতৃত্বের ধরন ও মানবিকতার জন্য। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন ঠিক তেমনই এক নাম।
২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনকাল শুধু নিউজিল্যান্ড নয়, বিশ্বরাজনীতিতেও রেখে গেছে এক অনন্য ছাপ। বয়সে তরুণ হয়েও তিনি দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব মানে শুধু কঠোরতা নয়, বরং সহানুভূতি ও মানবিকতার সমন্বয়।
২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানো, মাথায় ওড়না পরে অশ্রুসিক্ত চোখে বক্তব্য দেওয়া—এসব দৃশ্য বিশ্ববাসীর মনে অমোচনীয় হয়ে আছে। আবার কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি রাতের বেলায় ফেসবুক লাইভে এসে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। এভাবেই জেসিন্ডা রাজনীতিকে দিয়েছেন সহানুভূতির নতুন সংজ্ঞা।
মাত্র ৩৭ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হয়ে এবং একই সময়ে মা হয়ে তিনি নারীদের জন্য হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার প্রতীক। সংসদে সন্তান নিয়ে আসা কিংবা মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার মতো পদক্ষেপ রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
২০২৩ সালে তিনি ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর শক্তি অনুভব করছেন না—“I no longer have enough in the tank।” আধুনিক রাজনীতিতে এমন সৎ স্বীকারোক্তি বিরল। সমালোচনা থাকলেও অনেকে এটিকেই তাঁর নেতৃত্বের স্বকীয়তা হিসেবে দেখেছেন।
রাজনীতি ছাড়ার পর তিনি যুক্ত হয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে। ক্রাইস্টচার্চ কলের মাধ্যমে অনলাইনে ঘৃণাবাদ প্রতিরোধে কাজ করছেন এবং আর্থশট প্রাইজের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছেন।
২০২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা শুধু আত্মজীবনী নয়; বরং নেতৃত্বের এক নতুন দর্শন। এখানে তিনি দেখিয়েছেন—সহানুভূতি দুর্বলতা নয়, বরং এটি এক ধরনের শক্তি। ব্যর্থতা স্বীকার করা, জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেছেন।
বইয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ক্ষমতা তাঁর কাছে কখনো আধিপত্য নয়; এটি দায়িত্ব। মাতৃত্ব ও নেতৃত্ব একসঙ্গে সামলানোর অভিজ্ঞতাও খোলামেলা বলেছেন তিনি।
জেসিন্ডার নেতৃত্ব থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখতে পারে—
সহানুভূতি আস্থা গড়ে তোলে।ব্যর্থতা স্বীকার দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি।নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও যোগাযোগ অপরিহার্য।ক্ষমতা মানে দায়িত্ব, অহংকার নয়।বৈশ্বিক সমস্যায়ও নেতাদের ভূমিকা জরুরি।
রাজনৈতিক আলোচনায় হয়তো জেসিন্ডার নাম সময়ের সঙ্গে আড়াল হবে। তবে তাঁর নেতৃত্বের ধরন—সহানুভূতি, সাহস ও মানবিকতার মিশেল—ভবিষ্যতের কাছে থাকবে অনন্য এক দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতার মঞ্চেও মানবিকতা জায়গা করে নিতে পারে।
জেসিন্ডা আরডার্ন কেবল নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এক নতুন ধরনের নেতৃত্বের প্রতীক। তাই তাঁকে সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
সূত্র: বিবিসি