মেলবোর্ন, ১১ অক্টোবর- ২০২৩ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঢাকা সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাফাল যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রচারণা। তবে সেই সফর ফ্রান্সের প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ভারতের বিমানবাহিনীতে থাকা রাফাল বিমান নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে এবং ২০টি চীনা জে-১০সিই “ভিগোরাস ড্রাগন” বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
পাকিস্তান দাবি করেছে, তাদের জে-১০সি যুদ্ধবিমান ২০২৫ সালের মে মাসে চার দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতের একটি রাফাল বিমান ভূপাতিত করেছিল। তবে ভারত সেই দাবি অস্বীকার করেছে। পাকিস্তান ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জে-১০সি যুদ্ধবিমান যুক্ত করে, যা এখন মিনহাস বিমানঘাঁটিতে “কোবরা স্কোয়াড্রন”-এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য চুক্তির পরিমাণ প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ক্রয়মূল্য ছাড়াও প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি একটি সরকার-টু-সরকার (G2G) ভিত্তিক চুক্তি হিসেবে সম্পন্ন হতে পারে এবং ২০২৬ বা ২০২৭ অর্থবছরে স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, পুরো অর্থ পরিশোধ করা হবে ধাপে ধাপে ১০ বছরে, যা শেষ হবে ২০৩৫-৩৬ অর্থবছরে। এই কেনাকাটা হচ্ছে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’–এর অংশ হিসেবে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকীকরণ করা।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (বিএএফ) বহরে বর্তমানে ১৬টি চীনা চেংদু জে-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আটটি বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, যেখানে পরবর্তী ধাপে আরও চারটি বিমান কেনার বিকল্প রাখা হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সেই পরিকল্পনা বিলম্বিত হয়।
ভারত তখন তার নিজস্ব এলসিএ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব দিলেও বাংলাদেশ মূলত ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান কেনার দিকে আগ্রহী ছিল। রাফাল ও ইউরোফাইটার টাইফুনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হলে, ৩৩ বছর পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ২০২৩ সালে আবার ঢাকায় আসেন।
একজন বিমানবাহিনী কর্মকর্তা ইউরেশিয়ান টাইমসকে বলেন, “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনের পর হবে। ভারত রাফাল ব্যবহার করছে বলে ইউরোফাইটারের সম্ভাবনাই কিছুটা বেশি।”
ভারত এখন পর্যন্ত ৩৬টি রাফাল বিমান বিমানবাহিনীতে যুক্ত করেছে এবং নৌবাহিনীর জন্য আরও ২৬টি রাফাল এম কেনার অর্ডার দিয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় প্রস্তাব শক্তিশালী হওয়ার আগেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে শেখ হাসিনার পদত্যাগ নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে।
২০২৪ সালে বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান চীন সফর করেন এবং সেখানে বহুমুখী যুদ্ধবিমান ও আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার কেনার আগ্রহের কথা জানান। পরে ২০২৫ সালের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের সময় জে-১০সি কেনার আলোচনা নতুন গতি পায়।
এরপর বিমানবাহিনীর প্রধানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়, যার দায়িত্ব হলো চীনের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা, দাম নির্ধারণ, অর্থপ্রদানের শর্ত চূড়ান্ত করা এবং সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
বর্তমানে বিএএফ পুরোনো মিগ-২৯ ও এফ-৭ বিমান ব্যবহার করছে, যা আধুনিক যুদ্ধে খুব একটা কার্যকর নয়। তাই নতুন জে-১০সি কেনার মূল উদ্দেশ্য বিমানবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
জে-১০সি যুদ্ধবিমান: চীনের আধুনিক আকাশযুদ্ধের প্রতীক
জে-১০সিই হচ্ছে চীনা জে-১০সি–এর রপ্তানি সংস্করণ। এটি চতুর্থ প্রজন্মের উন্নত যুদ্ধবিমান, যাতে রয়েছে আধুনিক রাডার, ইলেকট্রনিক সিস্টেম, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি। এটি বর্তমানে চীনের বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জে-১০সি প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শিত হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে দুবাই এয়ারশোতে। এরপর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনা বিমানবাহিনী প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি YY-20 রিফুয়েলিং বিমান একসঙ্গে সাতটি জে-১০সি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করছে যা ছিল চীনের শক্তি প্রদর্শনের একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
এই বিমানটি জে-১০বি মডেলের উন্নত সংস্করণ। এতে রয়েছে নিজস্বভাবে তৈরি AESA রাডার, WS-10B ইঞ্জিন, PL-10 স্বল্পপাল্লার ও PL-15 দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।
বিমানটি প্রায়ই মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এতে রয়েছে আধুনিক ফ্লাই-বাই-ওয়্যার প্রযুক্তি, ডিজিটাল ককপিট, নির্ভুল লক্ষ্যভেদী হামলার ক্ষমতা, আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সুবিধা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে চীনা অস্ত্রের বাড়তি প্রভাব
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)–এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের পর বাংলাদেশই চীনা অস্ত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের দুই-তৃতীয়াংশই চীনা উৎস থেকে এসেছে।
মিং-শ্রেণির সাবমেরিন, এমবিটি-২০০০ ট্যাংক থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সবই এসেছে চীন থেকে। চীনা অস্ত্র তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এবং তাতে রাজনৈতিক শর্তও থাকে না। এই কারণেই ঢাকা বেইজিংয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ অভিযোগ করে যে চীনা কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা কিছু যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জামে ত্রুটি পাওয়া গেছে। করভেট জাহাজ, টহল নৌযান ও বিমানবাহিনীর কিছু যন্ত্রে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়।
এ ছাড়া চীনা তৈরি এফ-৭ যুদ্ধবিমান, স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কে-৮ডব্লিউ প্রশিক্ষণ বিমানের গোলাবারুদের সমস্যা নিয়েও বিমানবাহিনী উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের সামরিক সরঞ্জাম দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে নতুন রূপ
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুই দেশেই এখন চীনা যুদ্ধবিমান থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। ভারতের জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশে একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। যদি চীনা নৌবাহিনী সেই ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার পায়, তবে তা ভারতের পূর্ব নৌবাহিনী সদর দপ্তরের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ মাত্র ২০৩ মিলিয়ন ডলারে চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন কেনে, যা ২০১৬ সালে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান পলি টেকনোলজিস কক্সবাজার উপকূলে ১.২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ শুরু করে।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার চেয়ে আসছে। মিয়ানমারের পর এবার বাংলাদেশকেও সেই ভূরাজনৈতিক বৃত্তে যুক্ত করছে বেইজিং।
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, যা ভারতের পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোকেও ভাবিয়ে তুলছে।
সুত্রঃ ইউরেশিয়ান টাইমস