বিশ্ব

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে: আরাকান আর্মির অভিযোগ

  • 12:29 pm - October 17, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১২৫ বার
মিয়ানমার–বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি; মংডু এলাকায় সংঘর্ষের পর আরাকান আর্মির অভিযোগ বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে। (ছবি: দ্য বর্ডারলেন্স)

মেলবোর্ন, ১৭ অক্টোবর: মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA) বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কড়া সতর্কবার্তা জারি করেছে। তারা অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একাংশের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা চরমপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশে সীমান্তে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছেন যা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তি বিপন্ন করতে পারে।

আরাকান আর্মির এই বিবৃতি আসে ১১ অক্টোবর মংডু টাউনশিপে সংঘটিত এক হামলার পর, যেখানে রোহিঙ্গা চরমপন্থী সংগঠন আরসা (ARSA) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (RSO)–এর প্রায় দশজন সশস্ত্র সদস্য তিনজন স্থানীয় বাসিন্দাকে হামলা করে। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাত পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

‘দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের হাতেই অস্ত্র সরবরাহ’

আরাকান আর্মির প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মংডুর ঘটনার তদন্তে দেখা গেছে বিজিবির কিছু সদস্য অস্ত্র, গুলি ও সামরিক সরঞ্জাম পাচার করে জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছেন।
রেডিও এনইউজি-তে প্রকাশিত এক পোস্টে উল্লেখ করা হয়, আরাকান আর্মি দাবি করেছে যে, জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের উৎস শনাক্ত করে দেখা গেছে এগুলো “দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই এসেছে।”

এই কর্মকর্তারা আরসা ও আরএসও’র মতো সংগঠনগুলোর কাছে সামরিক মানের অস্ত্র বিক্রি বা সরবরাহ করছেন, যারা আবার মিয়ানমার সেনা জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সীমান্তে সন্ত্রাস ও হামলার সমন্বয় ঘটাচ্ছে।

আরাকান আর্মি অভিযোগ করেছে, এই বেআইনি লেনদেন এখন “পারস্পরিক সুবিধাভোগী এক গোপন চুক্তিতে” রূপ নিয়েছে যেখানে “বিজিবি ও সেনাবাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তা” সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তারা শুধু অস্ত্রই নয়, বরং চিকিৎসা সহায়তা, রসদ, খাবার ও লজিস্টিক সমর্থনও জঙ্গিদের দিচ্ছেন। এমনকি কিছু কর্মকর্তা রাডার-ভিত্তিক তথ্য ও আকাশ নজরদারি সংক্রান্ত তথ্যও ভাগ করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে আরাকান আর্মি।

আরাকান আর্মির দাবি, তারা ইতোমধ্যে ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, যাতে এসব দুর্নীতিবাজ ও সহযোগী কর্মকর্তাদের তদন্ত ও শাস্তির দাবি জানানো হয়। কিন্তু তাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায়, এই নীরবতা “দ্বিপাক্ষিক আস্থা বিনষ্ট ও সীমান্তে চরম অস্থিতিশীলতা” ডেকে আনছে বলে সতর্ক করেছে তারা।

তবে সংগঠনটি জানিয়েছে, তাদের বিবৃতি “শত্রুতামূলক নয়”, বরং “গঠনমূলক ও প্রতিরোধমূলক আহ্বান” যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

মংডুতে নতুন হামলা, বেসামরিক হতাহতের ঘটনা

সতর্কবার্তার মাত্র একদিন পরই মংডুতে ফের রক্তক্ষয়ী হামলা ঘটে। আরাকান আর্মির দাবি, ১১ অক্টোবর দুপুরে আরসা ও আরএসও জঙ্গিরা তিনজন মোটর সাইকেল চালককে লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলা চালায়।
তিনজনই সাধারণ পণ্য পরিবহনকর্মী ছিলেন ২২ বছর বয়সী কো নিয়াইন চান, ২৩ বছর বয়সী কো থাউং জিন, ও ৩৩ বছর বয়সী কো নায়িং লিন। নিয়াইন চান ঘটনাস্থলেই নিহত হন, অন্য দুইজন গুরুতর আহত অবস্থায় প্রাণে বাঁচেন।

আরাকান আর্মি জানিয়েছে, তাদের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটি বুথিডং ও মংডু সীমান্ত অঞ্চলের বেশিরভাগ সামরিক ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “আরাকান ন্যাশনাল কাউন্সিলের নেতৃত্বে আমরা জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জাতিগত সম্প্রীতি বজায় রাখতে কাজ করছি।”

বাংলাদেশ সীমান্তে আরসা ও আরএসও’র ঘাঁটি

আরাকান আর্মির তথ্য অনুযায়ী, আরসা ও আরএসও বাংলাদেশের ভেতরেও বেশ কিছু ঘাঁটি স্থাপন করেছে, যেখান থেকে তারা সীমান্তে হামলা ও অভিযানে অংশ নিচ্ছে। এই কার্যক্রমগুলো সরাসরি মিয়ানমার সেনা জান্তার স্বার্থে কাজ করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু ‘সহযোগী উপাদান’ জড়িত থাকতে পারে।

নাফ নদীর তীরে নতুন সংঘাতরেখা

এই সব ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত, বিশেষ করে নাফ নদী এলাকা, ক্রমেই এক নতুন সংঘাতরেখায় পরিণত হচ্ছে।
কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকায় অবস্থিত বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো, যেগুলো একসময় মানবিক আশ্রয়স্থল ছিল, এখন সেগুলোতেই জঙ্গি ও অপরাধী নেটওয়ার্কের অনুপ্রবেশ ঘটছে।
অস্ত্র বাণিজ্য, মানবপাচার ও চাঁদাবাজির জাল এই সীমান্তকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে অস্থির এলাকাগুলোর একটি করে তুলেছে।

আরাকান আর্মির অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কিছু সদস্য যদি সত্যিই এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন, তবে তা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়—বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও বড় হুমকি হবে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় “অস্বাভাবিক স্বাধীনতা” দিয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে এটি হয়তো গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু এর ফলে সীমান্তে সামরিকীকরণ আরও বাড়ছে যা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত উসকে দিতে পারে।

মিয়ানমারের সেনা জান্তা বর্তমানে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স (যার সদস্য আরাকান আর্মি)–এর সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যস্ত, এবং তারা সীমান্ত উত্তেজনাকে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি ঢাকা ও নাইপিদো দুই সরকার এখনই সংযম না দেখায় এবং আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা না করে, তবে নাফ নদীর তীর এক নতুন “ছায়াযুদ্ধের” ময়দানে পরিণত হতে পারে যার প্রভাব শুধু সীমান্ত নয়, বরং সমগ্র বঙ্গোপসাগর ও আসিয়ান অঞ্চলের শান্তির ওপর পড়বে।

সূত্র: By The Borderlens Desk

এই শাখার আরও খবর

নারীদের অপমান না করার বার্তা দিলেন থালাপতি বিজয়

তামিলনাড়ুর জনপরিসরে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর, অশ্লীল ও মানহানিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ও অভিনেতা থালাপতি বিজয়। তিনি বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত…

ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার জেরে কনস্যুলেট বন্ধ করছে ইসরায়েল

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার জেরে জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিনসহ…

ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই: রণধীর জয়সওয়াল

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে ভারতের কাছে এখনো নতুন কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন…

আওয়ামী লীগে শেখ সেলিমকে নিয়ে আলোচনা কেন

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে ঘিরে। দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের পর…

ইরানের ২৭ এয়ারলাইনসহ ৩৬ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের বিমান চলাচল খাতকে সহায়তার অভিযোগে দেশটির ২৭টি এয়ারলাইনসহ মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে…

রাজনৈতিক ইসলাম’ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনছে অস্ট্রিয়া

অস্ট্রিয়ায় তথাকথিত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে দেশটির সরকার। চ্যান্সেলর ক্রিশ্চিয়ান স্টকার এ ধরনের আইন প্রণয়নের পক্ষে অবস্থান…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au