বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ফিরছে অ্যাসিড সন্ত্রাসের পুরনো আতঙ্ক: ১০ মাসে দগ্ধ সাত নারী, মৃত্যু তিন

  • 5:09 am - November 08, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৪২ বার
এসিড নিক্ষেপের প্রতিকী ছবি

মেলবোর্ন, ৮ নভেম্বর- যৌতুকের চাহিদা পুরো না হওয়া, পারিবারিক নিয়মভঙ্গ বা প্রেম প্রত্যাখ্যান এসব অজুহাতে পুরুষ-প্রধান হিংসার একভাবেই ফিরছে: মুখ ও শরীর অবিশ্বাস্যভাবে ঝলসে যাওয়া। চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে দেশে অ্যাসিড নিক্ষেপে দগ্ধ হয়েছেন সাত নারী; তাদের মধ্যে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা শুধু শারীরিক ক্ষতই পান না, জীবনের মান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদাও হারান।

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার পূর্ব দরবারপুর গ্রামের খালেদা ইসলাম অমির জীবন সেই বাস্তবতার কাঁচাপাথরের মতো। ওই নারী যখন বাপের বাড়িতে নিরাপত্তা খুঁজে শুয়ে ছিলেন, সন্ধ্যার আগে জানালা থেকে ছুঁড়ে দেয়া একটি অ্যাসিড মিশ্রিত তরল কেবল মুহূর্তেই তার মুখ ও দেহ ঝলসে দেয়। এখনো চিকিৎসাধীন অমি আয়নায় নিজের মুখ দেখেন না। শব্দটাই বলেন, “মুখটা আর মুখ নেই। বেঁচে আছি, কিন্তু বেঁচে থাকা যেন শাস্তি।”

অন্য এক কিশোরীর চিৎকারও সিসেড নয়। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কুমপুরপুর এলাকার ২০ বছরের মাহমুদা খাতুন ১৭ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর থেকে যৌতুকের জন্য নির্যাতিত হন। ২০২১ সালে জামাই ছোড়া অ্যাসিডে দগ্ধ হন তিনি। মামলার হিসেব করে হলেও টাকার অভাবে সুষ্ঠু বিচারের পথ আটকে যায়; মামলাকারীরা জামিন পেয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী ফিরে পান অস্থির জীবন ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা।

তারাই নয়, সামগ্রিক ধারা দেখায় অ্যাসিড সন্ত্রাস একাধারে বদলায়ও এবং ফিরে আসে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সালে এই আক্রমণের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। ২০০২ সালে রেকর্ড করা ৪৯৬ ঘটনার পরে সরকার কঠোর আইন করে সমস্যার মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়। ওই সময় থেকে জনসচেতনতা ও আইনের জোরে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসে। তবু সাম্প্রতিককালে করোনাকাল এবং পরে নজরদারি ও মনিটরিং শিথিল হওয়ায় পুনরায় এই অপরাধ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সরকারি ও বেসরকারি নথি ও সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে: এই দশ বছরে হার অনেক কমলেও সমস্যা নিস্বর্গ হয়নি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-অক্টোবর পর্যন্ত সাতটি অ্যাসিড হামলা হয়েছে, মৃত্যু তিন; ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরে শিকার হয়েছেন ৮৪ জন নারী, মারা গেছেন ১০ জন। বেসরকারি অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের হিসাব বলছে ১৯৯৯ থেকে ২০২৩ মধ্যে প্রায় তিন হাজার ছয়শো ঘটনার কাছাকাছি,  যা দেখায় সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক।

অভিযোগগুলো যেখানে সবচেয়ে গোঁড়া, সেখানে বিচারঝুঁকি ও প্রক্রিয়ার ধীরগতি অপরাধীদের উৎসাহ যোগায়। আইনজীবী সুরাইয়া পারভীন বলেন, “ঘটনা সত্য হলেও এজাহার দুর্বল থাকে, সাক্ষী মেলে না। আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। বিচার প্রক্রিয়ার গতি ধীর হলে ভুক্তভোগীরা হয়ত হাল ছাড়েন।” নারী পক্ষের আইনজীবী কামরুন নাহার তীরক্ষণ জানিয়েছেন, জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলকে প্রতি তিন মাসে বৈঠক করার কথা থাকলেও দীর্ঘ কয়েক বছর তা হয়নি; জেলা পর্যায়েও মনিটরিং অনিয়মিত হওয়ায় প্রতিরোধ কার্যক্রম ঠেকেছে।

আইনের শূন্যতা ও প্রয়োগের দুর্বলতাও বড় সমস্যা। ২০০২ সালে অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ও অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন পাশ করা হলেও নির্দিষ্ট বিধিমালা তৈরির কোনো অগ্রগতি নেই। বিধিমালা না থাকা মানে তদন্ত-প্রক্রিয়া, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত নিয়ম শূন্য; ফলে আইনের ফাঁক অপরাধীদের সাহস বাড়ায়। মহিলা বিষয়ক সংস্কার আন্দোলনের কর্মী শিরীন হক বলেন, “যতক্ষণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বদলবে না, বিচারহীনতা ও সামাজিক উদাসীনতা থাকবে; ততদিন এ অপরাধ থেমে যাবে না।”

আরও একটি বড় ভয়াবহতার জন্ম বিচারহীনতার কালচক্র। ২০০২ সালের আগে এক মামলার নিষ্পত্তি দশ বছর লাগত; আইন করায় তা কমে চার মাসে নামানো সম্ভব হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। তবু উচ্চ আদালতে গেলে আবার অনেক সময় লাগে। দীর্ঘ মামলা, মহাজন-শক্তি ও স্থানীয় অশক্ত সাক্ষ্য ব্যবস্থা এসব মিলিয়ে অপরাধীরা স্বাধীনতার ঘোড়া পায়।

চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আর্থিক সাপোর্টের ব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক বেসরকারি সংস্থা অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন, এসএসএফ, রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে কাজ করে আসছে। তবে সেবা সীমিত, আরভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও কমছে না। সরকারি মনিটরিং শিথিল হওয়ায় লোকাল পর্যায়ে পোস্টার, স্কুল ক্যাম্পেইন, থানা পর্যায়ে তৎপরতা কমে গেছে। ফলত নতুন প্রজন্ম “অ্যাসিড কাণ্ডের ভয়াবহতা” সম্পর্কে যথেষ্ট শিক্ষা পাচ্ছে না।

তবু আশার কিছু আলোর রেখা আছে। অনেকে পুনর্বাসন করে সমাজে ফিরেছেন এবং অন্যদের পাশে দাঁড়ান। খুলনার জান্নাতুল ফেরদৌস ২০১৮ সালে অ্যাসিড হামলার শিকার; আজ তিনি ভুক্তভোগীদের পাশে কাজ করেন বলে জানান, “আমি বাঁচেছি কারণ পাশে মানুষ ছিল। এখন অন্যদেরও বাঁচাতে চাই।” বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কার্যকর পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও মানসিক সেবা দিতেই পারলে অনেক বদল সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান আইনের কার্যকর প্রয়োগ ছাড়াও সামাজিক মনোভাব বদলানো। মানবিক শিক্ষা, নারীর মর্যাদা ও সমতার নীতির ব্যাপক প্রচার, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে মোকাবিলা এসব ছাড়া শুধু আইনই যথেষ্ট হবে না। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর করতে সরকারকে বিধিমালা প্রণয়ন, জেলা পর্যায়ে মনিটরিং পুনরায় চালু করা, এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আর্থসামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।

আগুনে ঝলসে যাওয়া প্রতিটি মুখ কেবল শারীরিক ক্ষত নয়; তা দেশের নৈতিক দায়বদ্ধতার এক চিহ্ন। যদি সমাজ চায় এই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে, এখনই আইনী প্রয়োগ জোরদার ও সামাজিক শিক্ষাকে গতিশীল করতে হবে, নয়তো পুরনো আতঙ্ক ফের অনেক পরিবারে ছায়া ফেলবে।

সুত্রঃ দৈনিক সমকাল

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থান সম্পর্কে দুর্গাপূজা কী বার্তা দেয়?

দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপন, পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বিএনপি সরকার। তবে উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ হওয়াই…

বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী গড়তে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী’ প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত…

ফ্রান্স থেকে স্পেন, ইউরোপজুড়ে কেন রাস্তায় নামছে জেন-জি?

আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম, আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে…

‘আমি শুধু চাই, তাকে থামানো হোক’: দণ্ডিত ধর্ষকের বিরুদ্ধে সাহসী সতর্কবার্তা ভুক্তভোগীর

দুই তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করা এক ব্যক্তি আবারও একই ধরনের অপরাধের চেষ্টা করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতিবন্ধী সহায়তা কর্মসূচি এনডিআইএসের…

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিতে অস্বস্তিতে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি, চাপে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানির…

দিল্লিতে হঠাৎ এনএসআই মহাপরিচালক, আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সারওয়ার ফরিদের দিল্লি সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au