বাংলাদেশ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থান সম্পর্কে দুর্গাপূজা কী বার্তা দেয়?

  • 1:21 am - October 27, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩২ বার
দুর্গাপূজার মহানবমী উপলক্ষে ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে পূজারিদের সঙ্গে সেলফি তুলছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপন, পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বিএনপি সরকার। তবে উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ হওয়াই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অতীতের হামলা, সাম্প্রতিক সহিংসতার অভিযোগ এবং রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন বলছে, এই নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ সারা বছর ধরে বজায় রাখাই সরকারের বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা গত ২১ অক্টোবর শেষ হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে এবার বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উৎসবটি উদ্‌যাপিত হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতায় আসার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এটিকে বিএনপি সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উৎসবের সময় ঢাকার বাইরে কয়েকটি বিভাগীয় শহরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে আলোচনায় আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের সফর এবারই প্রথম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে উৎসবের আনন্দের বাইরেও এবারের দুর্গাপূজা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণা ছিল, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তুলনামূলক বেশি নিরাপদ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের ফল সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিএনপি সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা

বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও ব্যাপক আয়োজনে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে হিন্দু প্রায় ৭ কোটি। এ বছর রাজ্যটিতে প্রায় ৫৮ হাজার পূজামণ্ডপ তৈরি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ। এ বছর দেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। অর্থাৎ হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের অধীনে এটাই ছিল প্রথম দুর্গাপূজা। ফলে ধর্মীয় উৎসবটির তাৎপর্য কেবল উদ্‌যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন সরকারের সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অঙ্গীকারেরও পরীক্ষা ছিল এটি।

অতীতের বিভিন্ন বছরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এবারও আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব শুরু হওয়ার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ঘটনার খবর পাওয়া যায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় এসব ঘটনা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকার শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে।

তিন দিনের ছুটি ও বাড়তি আর্থিক সহায়তা

দুর্গাপূজায় টানা তিন দিনের সরকারি ছুটির দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিজয়া দশমীতে এক দিন সরকারি ছুটি ছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ছুটি বাড়িয়ে দুই দিন করে।

এ বছর বিএনপি সরকার দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন নির্ধারণ করে। ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ছুটির পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পান মানুষ।

উৎসবের পরিবেশ আরও আনন্দমুখর করতে সরকার চাহিদার চেয়ে বেশি আর্থিক সহায়তাও বরাদ্দ করেছে।

হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট দুর্গাপূজার জন্য ৪ কোটি টাকা চাইলেও সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ৫ কোটি টাকা। একইভাবে, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানের জন্য ২ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল, বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি টাকা।

এখানে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় উৎসব উদ্‌যাপনে সহায়তা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগের বিষয়টি এতে উঠে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে এবারের দুর্গাপূজায় নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উৎসবমুখর পরিবেশের প্রশংসা করেছেন।

‘হিন্দুরা কারও ভোটব্যাংক নয়’

গত ২০ অক্টোবর দুর্গাপূজা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা ছাড়াও রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাঁদের বিভিন্ন উদ্বেগ ও সমস্যার কথা শোনেন।

এর আগে ১৬ অক্টোবর দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধানমন্ত্রী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ভয়ভীতি ছাড়াই আনন্দ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপনের আহ্বান জানান।

তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ধর্ম ব্যক্তির, রাষ্ট্র সবার।”

সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি এমন একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশকে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপিকে তুলনামূলক রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতাও রয়েছে। অতীতে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটও গঠন করেছে। তবে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক দর্শনে উদার গণতন্ত্রের কথা বলে।

১৬ অক্টোবর ঢাকার বনানী এলাকার একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের কারও ভোটব্যাংক হওয়ার প্রয়োজন নেই।”

তিনি নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার বিবেচনায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যবহার করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ আমলেও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে

সংখ্যালঘুদের জন্য আওয়ামী লীগকে দীর্ঘদিন তুলনামূলক নিরাপদ রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দলটির দীর্ঘ শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বৈষম্যের ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা এবং ২০২১ সালে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা থেকে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ওই সহিংসতায় ছয়জন নিহত হন।

এসব ঘটনা দেখিয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, এমন নিশ্চয়তা ছিল না।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ হিন্দু। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জন্মহারের পার্থক্যের পাশাপাশি দেশত্যাগও জনসংখ্যায় হিন্দুদের আনুপাতিক হার কমে যাওয়ার একটি কারণ।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং উপাসনালয়ে আক্রমণের অভিযোগ ওঠে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব ঘটনার বেশির ভাগের পেছনে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে। তবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষও কিছু ঘটনার কারণ ছিল।

২০২৫ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর উল্লেখ করে, এসব সহিংসতার পেছনে ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্য, আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, জমি নিয়ে বিরোধ এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বসহ একাধিক কারণ ছিল।

প্রতিবেদনে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কিছু নেতা-কর্মীর হামলায় জড়িত থাকার কথাও উঠে আসে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোনো দল এসব হামলা সংগঠিত করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এসব ঘটনার পরও বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেশী ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের সমর্থনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। ৩০০টি নির্বাচিত সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি এবং জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন।

নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অনেক হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাতেও বিএনপি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে।

নেট্রা নিউজ ৪০ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রের ফলাফল ও ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করেছে। ভোটার তালিকায় থাকা নামের ভিত্তিতে যেসব এলাকায় অর্ধেকের বেশি ভোটার হিন্দু বলে অনুমান করা হয়েছে, এমন ১ হাজার ৮৮টি ভোটকেন্দ্র বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৯৮৪টিতে এগিয়ে ছিল বিএনপি। দলটি বৈধ ভোটের ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ পেয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট।

এই পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকেছেন। তবে ভোটারদের ধর্মীয় পরিচয় সরাসরি যাচাই না করে নামের ভিত্তিতে করা এই বিশ্লেষণকে সব সংখ্যালঘু ভোটারের পছন্দের নির্ভুল প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় না।

সংসদে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কম

এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চারজন প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন হিন্দু এবং দুজন বৌদ্ধ। চারজনই বিএনপির মনোনীত প্রার্থী।

পরে সংরক্ষিত নারী আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আরও চারজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। তাঁরাও বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলে সংসদে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট প্রতিনিধির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটে।

তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যায় সংখ্যালঘুদের অংশের তুলনায় সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত।

এটি দেখায়, কেবল প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পূজার আগে ৩৪টি ঘটনার অভিযোগ

দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও উৎসবের আগে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি দেশজুড়ে ৩৪টি ঘটনার অভিযোগ জানায়। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা এবং অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা ছিল। সংগঠন দুটির দাবি, এসব ঘটনার মধ্যে ১১টিতে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

পরে পুলিশ জানায়, তদন্তে কয়েকটি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, চুরি এবং অন্যান্য কারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যা-ই হোক, তাঁদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ২৫৭টি ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের উভয়ের শাসনকাল অন্তর্ভুক্ত।

সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনার মধ্যে ৪০টি ঘটনায় ৪৪ জন নিহত হয়েছেন। তবে এসব পরিসংখ্যান সংগঠনটির নিজস্ব হিসাব ও অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও দায় নির্ধারণে পৃথক তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেরও যোগসূত্র রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল বিষয়।

শেখ হাসিনার শাসনামলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পেছনে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিচয়ও ভূমিকা রেখেছিল।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শেখ হাসিনাকে ঘিরে মতপার্থক্য, সীমান্ত, বাণিজ্য ও পানি বণ্টনের মতো বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়েছে।

তবে এবারের দুর্গাপূজার আয়োজন ভারতের কিছু সমালোচকের কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

কলকাতাভিত্তিক সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ পূজার আয়োজনের ব্যাপকতা ও জাঁকজমকের প্রশংসা করেছেন। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সীমান্তের ওপারে কিছু মহলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে এই পরিবর্তন ভারতের বিএনপি-সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংশয় কমাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।

উৎসবের নিরাপত্তা সারা বছর বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ

এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপিত হওয়া বিএনপি সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। প্রধানমন্ত্রীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, ছুটির মেয়াদ বাড়ানো এবং আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি সংখ্যালঘুদের প্রতি সরকারের মনোযোগের বার্তা দিয়েছে।

কিন্তু একটি উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ হওয়া আর সংখ্যালঘুদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। অতীতের হামলার বিচার, সাম্প্রতিক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপি সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে চায়, তা উৎসবের কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ধরে বজায় রাখতে পারবে কি না, সেটিই হবে তাদের জন্য বড় পরীক্ষা।

সূত্র: ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’

এই শাখার আরও খবর

ধানমন্ডিতে সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধনে পুলিশের বাধা, আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি

ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধন কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক…

আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্য: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল না, বলছে পুলিশ

‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার…

বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী গড়তে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী’ প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত…

ফ্রান্স থেকে স্পেন, ইউরোপজুড়ে কেন রাস্তায় নামছে জেন-জি?

আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম, আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে…

‘আমি শুধু চাই, তাকে থামানো হোক’: দণ্ডিত ধর্ষকের বিরুদ্ধে সাহসী সতর্কবার্তা ভুক্তভোগীর

দুই তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করা এক ব্যক্তি আবারও একই ধরনের অপরাধের চেষ্টা করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতিবন্ধী সহায়তা কর্মসূচি এনডিআইএসের…

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিতে অস্বস্তিতে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি, চাপে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানির…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au