অর্থনীতি ক্রমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৭ নভেম্বর- বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নানা চাপে আছে। মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি, বেসরকারি খাতে ঋণ কমছে, ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু এগুলোকে সরাসরি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা বলা সঠিক নয়। কারণ সমস্যা তৈরি হয়েছে অনেক আগেই এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহারের যে প্রভাব ছিল, তার স্বাভাবিকীকরণই এখন কঠিন মনে হচ্ছে। মূল কথা হল, অর্থনীতি ক্রমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে এবং এই পরিবর্তন স্বভাবতই কিছুটা কঠিন।
বর্তমান সরকার নাকি একটি “অচল অর্থনীতি” পেয়েছে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতে “স্থবির অর্থনীতি” তুলে দেবে, এমন মন্তব্য বিশ্লেষণধর্মী নয়। এখানে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, দেশের অর্থনীতি কেমন অবস্থায় ছিল তারা দায়িত্ব নেওয়ার দিন? হিসাবপত্র কি বাস্তব ছিল, নাকি আগেই সাজানো ছিল? বাজারের অবস্থা কি ছিল স্বাভাবিক, নাকি নিয়ন্ত্রিত? অর্থনীতি কি উৎপাদনমুখী ছিল, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ আত্মসাৎ করা হচ্ছিল?
গত সরকার আমলে দেশের আর্থিক খাত গভীরভাবে বিকৃত হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো ব্যাংকগুলোকে প্রায় ব্যক্তিগত এটিএমের মতো ব্যবহার করেছে। রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ কিছু গ্রুপ খুব কম জামানতে বিপুল ঋণ নিয়েছিল এবং তা পরিশোধের চাপও ছিল না। ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংক থেকে বেক্সিমকোর নেওয়া ২৪ হাজার কোটি টাকার মতো বড় অঙ্কের ঋণ শুধু পরিশোধ হয়নি, দেশের বাইরে চলে গেছে। এই অর্থ চলে গেছে সিঙ্গাপুর, দুবাই, লন্ডন, টরন্টোসহ নানা স্থানে।
এসব ঋণই তখন বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধিকে কাগজে কলমে বাড়িয়ে দেখিয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হলেও তা ছিল সাজানো দৃশ্য। সম্প্রতি কিছু মন্তব্যে বলা হয়, এখন ঋণ কমছে মানে অর্থনীতি স্থবির। কিন্তু এটি ঠিক যেমন বন শেষ হয়ে যাওয়ার পর কাঠ চোরাচালানের কমে যাওয়ায় অভিযোগ তোলা। প্রশ্ন হল, কেমন ধরনের ঋণ কমেছে এবং কোন কাজে সেই ঋণ ব্যবহৃত হচ্ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এখন ঋণ বিতরণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে না। ফলে ঋণের পরিমাণ কমেছে, কিন্তু মান বেড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি বহু বছরের মধ্যে কম হলেও তা আগে যে অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রজননশীল ঋণ দেওয়া হতো, তা কমে যাওয়ার কারণেই। এখন যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তা বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার বদলে দেশের উৎপাদন খাতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
মুদ্রাস্ফীতির তুলনায়ও ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের ৮ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি অনেক সময় শ্রীলঙ্কার ২.১ শতাংশের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু এই তুলনায় প্রেক্ষাপট বাদ পড়ে যায়। শ্রীলঙ্কা IMF এর কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার অধীনে আছে, যার ফলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা খুব কমে গেছে। সে কারণে মুদ্রাস্ফীতি কম। বাংলাদেশে ভোক্তা চাহিদা এখনো রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, আয় বাড়েনি, কিন্তু বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি মূলত আগের সরকারের তৈরি করা কৃত্রিম পরিস্থিতির ধারাবাহিক প্রভাব। তখন দেশসহ বিশ্বে সুদের হার বাড়ছিল, কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক নির্দেশে টাকা ছাপানো হয়েছিল। এখনকার মুদ্রাস্ফীতি সেই দেরিতে ধরা পড়া ফল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তথ্যের সঠিকতা। ১৫ বছর ধরে অর্থনৈতিক তথ্য অনেকটাই সাজানো হত। জিডিপি, রিজার্ভ, খেলাপি ঋণ, কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রেই বাস্তবতা গোপন করে সুন্দর ছবি দেখানো হয়েছিল। এই সরকার সেই সাজানো তথ্য বন্ধ করেছে। ফলে বাস্তব সংখ্যা সামনে আসায় অর্থনীতি খারাপ দেখাচ্ছে, বাস্তবে খারাপ হয়নি। খারাপ সংখ্যা আসলে সৎ হিসাবের পরিচায়ক।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও গত অর্থবছরে প্রায় ২০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবেগ নয়, হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। এটি প্রমাণ করে, দেশের নীতি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আগের তুলনায় বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে।
সমালোচকদের কেউ কেউ দারিদ্র্য বৃদ্ধির কথা বলেন। একটি ছোট জরিপে ২৮ শতাংশ দারিদ্র্যের কথা বলা হলেও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, এই অর্থবছরে দারিদ্র্য কমবে। তাই উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটিও জরুরি।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এখন একটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে। বিনিয়োগের আস্থা শুধু পরিসংখ্যান দেখে ফিরে আসে না, আসে নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিশ্বাস থেকে। অন্তর্বর্তী সরকার সব সমস্যা দূর করতে পারেনি, কিন্তু অপব্যবহারকে আড়ালও করছে না। যারা আগে ক্ষমতার জোরে ব্যবসা চালাত, তাদের প্রভাব কমেছে।
চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। ব্যাংক খাতের ২৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি হওয়া বিশাল সমস্যা। পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা কঠিন হতে পারে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ফিরতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি উদ্বেগের বিষয়। আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা দেয়।
তবুও সমস্যা দৃশ্যমান হওয়াই ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। আগে সমস্যাগুলো লুকানো ছিল। এখন সমস্যাগুলো সামনে এসেছে, তাই পরিস্থিতি খারাপ মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন একদিকে দুর্বল, অন্যদিকে সুস্থ হওয়ার পথে। ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। পরবর্তী সরকার হয়তো একটি স্থবির নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ও বাস্তবমুখী অর্থনীতি পাবে। অনেক দিন ধরে অর্থনীতিকে গল্প বানিয়ে সাজানো হয়েছে। এখন বাস্তবতা বোঝার সময়।
লেখক: ফয়সাল মাহমুদ, প্রেস মিনিস্টার, বাংলাদেশ হাইকমিশন, নিউ দিল্লি।