ডেঙ্গুতে ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৫৭
মেলবোর্ন, ২৫ জুন- দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও…
মেলবোর্ন, ৮ ডিসেম্বর- মাদারীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে নিজের ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে ভেঙে পড়েছিলেন ফয়সাল হোসেনের মা। পরিবারের কাছে তিনি বলেছিলেন দুবাইয়ে কাজ পেয়েছেন। বাস্তবে তিনি পাকিস্তানের তেহরিক–ই–তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামের জঙ্গি গোষ্ঠীর হয়ে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন।
খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলায় ২৬ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে তাঁর মৃত্যু হয়। গণমাধ্যমে প্রচারিত মরদেহের ছবিতে ভাই আরমান তাঁকে শনাক্ত করেন। ফয়সাল এখন পর্যন্ত অন্তত চারজন নিহত বাংলাদেশির একজন, যারা পাকিস্তানে গিয়ে টিটিপির হয়ে লড়াই করেছিলেন।
বাংলাদেশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট জানায়, আরও অন্তত দুই ডজন বাংলাদেশি বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাকিস্তানে সক্রিয়। ২০২৩ সালের পর এই ধারা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ঢাকার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে।
২২ বছর বয়সী জুবায়ের আহমেদের মৃত্যুর খবর পরিবার পায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। অ্যালেয়া আক্তারকে অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে তাঁর ছেলের মৃত্যুর কথা জানানো হয়।
অন্যদিকে ২৯ বছর বয়সী রতন ঢালীর ভাগ্য আজও অনিশ্চিত। প্রথমে সিটিটিসি জানায় তিনি নিহত হয়েছেন। পরে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দাবি করা হয় রতন জীবিত। তদন্তে সিটিটিসি ভিডিওটিকে ভুয়া বলে উল্লেখ করেছে। টিটিপির মুখপাত্র ইমরান হায়দারও মৃত্যুর দাবি প্রত্যাহার করেন।
রতনের পরিবারের কাছে অনিশ্চয়তা এখন সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। “আমাদের কিছুই জানানো হয় না। শুধু বলা হলো মারা গেছে। কিন্তু আদৌ কি ঘটেছে আমরা জানি না,” বলেন তাঁর বাবা আনোয়ার ঢালী।
রতন শেষবার ভিডিও কলে কথা বলেন ২০২৪ সালের ঈদের দিন। জানান দিল্লিতে আছেন, শিগগিরই দুবাই যাবেন। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই।
ফয়সাল পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও ২০২৪ সালের মার্চে জানান যে তিনি দুবাই যাবেন। বলেন, একজন পরিচিত তাঁর যাবতীয় খরচ বহন করবেন। রতনও প্রায় একই গল্প শোনান। দুবাইয়ের একটি ক্লিনিকে কাজের কথা বলে তিনি ঘর ছাড়েন।
সিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী তাঁরা দুজনই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ঢোকেন। কলকাতা, পরে দিল্লিতে কয়েক দিন কাটিয়ে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানে পৌঁছান। এরপর টিটিপির দলে যোগ দেন।
জুবায়েরের যাত্রা ছিল ভিন্ন। তিনি ওমরাহ করতে সৌদি আরব যান। এরপর সেখান থেকেই বৈধ কাগজে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন এবং আর দেশে ফেরেননি।
ফয়সাল, রতন ও জুবায়েরের জীবনযাত্রা নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে সাধারণ এক গল্পেরই অংশ। কাজের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আর অনলাইনে ভুল ব্যাখ্যা করা ধর্মীয় বক্তব্য তাঁদের দুর্বল করে তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাস্শার হাসান বলেন, আর্থিক প্রলোভন সবচেয়ে বড় অস্ত্র। গ্রামীণ বা প্রান্তিক এলাকার তরুণেরা সহজেই বিপথে পরিচালিত হন।
টিটিপির মুখপাত্র ইমরান হায়দার অবশ্য দাবি করেন, কেউ প্রতারণার শিকার হননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা নিজেদের ইচ্ছায় গেছেন।
সিটিটিসি বলছে, বাংলাদেশিদের শুধু টিটিপিতেই নয়, টিএলপি ও আইএমপিসহ আরও অন্তত দুটি পাকিস্তানি সংগঠনে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ জনকে শনাক্ত করতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যা ছড়িয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
দেশের ভেতরে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা কমে এলেও বিদেশে গিয়ে লড়াইয়ের নতুন ধারা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভিন্ন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সাভারে দায়ের হওয়া একটি মামলায় অভিযোগ ছিল টিটিপির হয়ে পাকিস্তানের ভেতরে নাশকতার ষড়যন্ত্র। দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ বড় জঙ্গি হামলা ছিল ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারিতে। এরপর সরকার নয়টি সংগঠন নিষিদ্ধ করে। কিছু নিষিদ্ধ সংগঠন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে, যেগুলোকে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।
রতন ঢালীর ভিডিওটি সত্য কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। তাঁর পরিবারের মতো আরও অনেক পরিবার এখন দোটানায় দিন কাটাচ্ছে।
কেউ ফিরছে লাশ হয়ে, কেউ নিখোঁজ, আর কেউ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে সীমান্তের ওপারে অচেনা যুদ্ধক্ষেত্রে।
একটি নতুন ধাপের জঙ্গিবাদ তৈরি হয়েছে, যার শিকড় রয়েছে অনলাইন নেটওয়ার্কের অদৃশ্য অন্ধকারে। এর বিরুদ্ধে লড়াই তাই আরও জটিল হয়ে উঠছে।
লেখক: বাংলাদেশের একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক;
সুত্রঃ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au