মেলবোর্ন, ১৯ ডিসেম্বর- বৃহস্পতিবার রাতের বাংলাদেশের ময়মনসিংহের জেলার ভালুকা উপজেলায় ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণহানির সংবাদ নয়- এটি বাংলাদেশের বিবেক, আইনের শাসন ও মানবিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।
সংখ্যালঘু হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাস-কে ‘ধর্ম অবমাননা’র কথিত অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, গাছে বেঁধে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমন দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সারা বিশ্বের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ভয়াবহ বিষয় হলো, ঘটনার এত সময় পরেও পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো মামলা দায়ের করেনি।
পুলিশের বক্তব্য, নিহতের নিকটজনের সন্ধান করা হচ্ছে; তারা অভিযোগ দায়ের করলে তবেই মামলা হবে। অথচ কয়েকশ মানুষের সামনে, মহাসড়কের পাশে, প্রকাশ্যে সংঘটিত একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড কি রাষ্ট্রের নজরে পড়ার জন্য কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগের অপেক্ষা করে? এই প্রশ্নেই আজ উত্তাল সমাজমাধ্যম।

শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে কথিত ইসলাম অবমাননার অভিযোগে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে তৌহদী জনতা। ছবিঃ সংগৃহীত
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, দীপু দাসকে প্রথমে কর্মস্থল থেকে বের করে মারধর করা হয়। পরে অর্ধমৃত অবস্থায় গাছে ঝুলিয়ে আবার লাঠিপেটা করা হয় এবং শেষে দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের সময় বহু মানুষ উপস্থিত ছিল, তাদের কেউ কেউ আবার ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচারও করছিল।
এই দৃশ্য প্রমাণ করে-খুনিরা লুকোয়নি, বরং তারা নিশ্চিত ছিল যে কেউ তাদের থামাবে না।
যে অভিযোগের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ড, তা নিয়েও আজ পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। কোথায়, কখন, কীভাবে, কার সামনে দীপু দাস ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন? এ প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর কেউ দিতে পারেনি।
আবার সেই অভিযোগ যাচাইয়ের কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম ছিল না। ধর্মীয় উগ্রগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই যুবককে হত্যা করেছে।
ঘটনার পর ভালুকা থানার ডিউটি অফিসার গণমাধ্যমকে বলেছেন, “নবী সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে উত্তেজিত জনতা হত্যা করেছে।” এই একটি বাক্যেই ভয়াবহ বাস্তবতা ফুটে ওঠে-যেখানে ‘উত্তেজিত জনতা’ যেন আইন, আদালত ও রাষ্ট্রের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
দীপু দাসে এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ‘ধর্ম অবমাননা’র কথিত অভিযোগে একের পর এক সংখ্যালঘু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। একটি ক্ষেত্রেও অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
পুলিশের একটি অংশ স্বীকার করছে-এগুলো আসলে সংগঠিত ধর্মীয় মব-সন্ত্রাস। কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে অভিযোগ রটিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা হচ্ছে।
আরও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো-স্থানীয় মানুষ সত্য বলতে ভয় পায়। কেউ সংবাদমাধ্যমে কথা বললে নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছে। এমনকি পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেও তথ্য দিতে এক ধরনের ভয় কাজ করছে। যেন সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এক অদৃশ্য, ভয়ংকর শক্তির দ্বারা।
OTN Bangla স্পষ্টভাবে বলতে চায়-ধর্ম কোনোভাবেই হত্যার লাইসেন্স হতে পারে না। অভিযোগ মানেই হত্যা করে ফেলা-এমন সমাজ কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে না।
দীপু দাসের মৃত্যু বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর দীর্ঘদিনের নির্যাতনের আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়।
এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং জড়িত সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা অন্যায়কে উৎসাহ দেয়।
আজ যদি দীপু দাসের জন্য ন্যায়বিচার না হয়, তবে আগামীকাল এই আগুন যে কার দরজায় এসে দাঁড়াবে-তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।
নীরবতা নয়, ভয় নয়-এই বর্বরতার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারই হোক আমাদের একমাত্র পথ।
আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি।