স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। ছবি: বাংলানিউজ
মেলবোর্ন, ২২ ডিসেম্বর- জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির কর্মী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম।
রোববার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ফয়সালের সর্বশেষ অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করছে। তিনি জানান, অনেক সময় অপরাধীরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়, সে বিষয়টিও মাথায় রেখে তদন্ত এগোচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক কি না, কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি। তবে সঠিক তথ্য বের করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে হত্যাকাণ্ডটির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে আপাতত মনে হয়নি। ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠে রয়েছে এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সম্ভাব্য সব দিক যাচাই করা হচ্ছে।
গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুই হামলাকারী ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে সরকারিভাবে তাকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকদের সর্বাত্মক চেষ্টার পরও ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া ওসমান হাদি পরে ইনকিলাব মঞ্চ গড়ে তুলে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান নেন। নিয়মিত টেলিভিশন টক শোতে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্যের ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় এক মাস আগে হত্যার হুমকি পাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন ওসমান হাদি। গত নভেম্বরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, দেশি ও বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা তাকে নজরদারিতে রেখেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে সব আশঙ্কার মধ্যেও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবেন না বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
মৃত্যুর পর ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ওসমান হাদির মরদেহ দেশে আনা হয় এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে রাখা হয়। পরদিন জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখের নাম উঠে আসে। ঘটনার পরপরই তারা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে গুজব ছড়ালেও গোয়েন্দা পুলিশ শুরু থেকেই এ দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে। পুলিশ বলছে, নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে না এবং তদন্ত চলবে।