বিশ্ব

বাংলাদেশ কি সন্ত্রাসের কেন্দ্র হয়ে উঠছে?- বিশ্লেষণ: এ. জাতিন্দ্র

  • 2:37 pm - December 27, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৬৬৭ বার
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভেঙে ফেলার সময় একদল উগ্র গোষ্ঠীর সদস্যকে জাতীয় পতাকার ওপরে ইসলামিক চেতনার পতাকা তুলে ধরতে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন ২৭ ডিসেম্বর: শ্রীলঙ্কাভিত্তিক স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও থিঙ্ক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ–ত্রিনকমালির প্রধান এ. জাতিন্দ্র মনে করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস প্রশ্ন তুলছে, বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে ভারতের কৌশলগত বলয় থেকে সরে যাচ্ছে এবং একটি বিপজ্জনক উগ্রপন্থী পথে এগিয়ে যাচ্ছে কি না।

এই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে ২০২৪ সালের আগস্টে, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর সরকার ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনা ভারত আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, যা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায়।

এরপর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং ভারতবিরোধী আবেগের এক বিপজ্জনক সংমিশ্রণ দৃশ্যমান হয়েছে। এই প্রবণতা আরও তীব্র হয় র‌্যাডিক্যাল নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যার পর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উগ্র ছাত্র সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা হাদি ছিলেন ভারতবিরোধী এবং তথাকথিত ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর প্রবক্তা। তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে “ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী শহীদ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা বড় আকারের ভারতবিরোধী বিক্ষোভ উসকে দেয়।

শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল আদর্শ ও ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্রুতই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করার পদক্ষেপ নেয়। ভারত থেকে তাঁর প্রত্যর্পণ চাওয়ার পাশাপাশি ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার চালানো হয় এবং পরে তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এটি বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

অন্যদিকে, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত হয়ে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামীকে আবার রাজনৈতিক দলে পরিণত করার অনুমতি দেয় সুপ্রিম কোর্ট। মৌলবাদী গোষ্ঠীর চাপে পড়ে ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মৌলবাদী শক্তিগুলো পদ্ধতিগতভাবে মুজিব পরিবারের প্রো-ইন্ডিয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলতে চাইছে।

জাতিন্দ্রের মতে, বাংলাদেশের এই ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে আসা কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এর সুস্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এটি পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে একটি নতুন জোটের পথ তৈরি করছে, যা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

ইউনূস সরকারের সময়কালে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব দ্রুত বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ইউনূস অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ নন; তাঁকে মূলত ছাত্র আন্দোলন ও মৌলবাদী চাপ সামাল দিতে আনা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তিনি সেই শক্তিগুলোকেই আরও শক্তিশালী করে তুলছেন।

‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ধারণাকে তিনি প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। এমনকি তিনি বিদেশি প্রতিনিধিদের একটি বই উপহার দেন, যার মলাটে এই ধরনের মানচিত্র ছিল, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতবিরোধী বার্তা ছড়ানোর প্রতীকী প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ক্ষমতা গ্রহণের পর ইউনূসের প্রথম চীন সফরও একটি বড় বার্তা বহন করে। বেইজিংয়ে তিনি চীনকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘সমুদ্রবিহীন’ বলে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশই নাকি ওই অঞ্চলের সমুদ্রের ‘রক্ষক’। এটি ভারতকেন্দ্রিক নীতির স্পষ্ট বিচ্যুতি বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। তাহের জামায়াতের উগ্র ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা। তাঁর বক্তব্য, চীন সফরে তাঁদের সরকারপ্রধানের মতো সম্মান দেওয়া হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে বেইজিং ভবিষ্যতের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে সচেতন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো পরিস্থিতি ভারতের জন্য এক ধরনের ‘পিন্সার মুভমেন্ট’, যেখানে চীন ও পাকিস্তান সমন্বিতভাবে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে সহিংসতা ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান নিয়ে সরকারের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তাও প্রশ্নের মুখে। অনেকের ধারণা, ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ই বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে যদি পাকিস্তানপন্থী জামায়াত ও তাদের মিত্ররা শক্ত অবস্থান নেয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ আমূল বদলে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এর সরাসরি নিরাপত্তা প্রভাব পড়বে ভারতের ওপর এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

অনুবাদ: ড. প্রদীপ রায়,

সম্পাদক, ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্ন: মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ কেন প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল?

ভারতবর্ষের মুসলমানদের কেন নিজেদের জন্য আলাদা দেশ প্রয়োজন হয়ে উঠলো? মোটামুটি তিনশো বছর ভারত ‘মুসলিম শাসনে’ ছিল। এই সময়ে ভারতবর্ষের রাষ্ট্র ভাষা আরবী ফারসি ছিল।…

১৪ ডিসেম্বর দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা, ওই সময়েই স্থানীয় নির্বাচন

শেখ হাসিনা আগামী ১৪ ডিসেম্বর দেশে ফিরতে চান। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত বিজয় দিবস পালন করে থাকে।‌ ১৯৭১-এর ওই দিনে ঢাকায় মিত্র বাহিনীর (মুক্তি…

তৃণমূলের দুই পক্ষই চায় জোড়াফুল, প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করার সম্ভাবনা

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই পক্ষ কোন প্রতীকে ভোটে লড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষই ‘জোড়াফুল’ প্রতীক চেয়ে…

সুদানে সোনার খনি ধসে নিহত অন্তত ৮২, আরও অনেকে নিখোঁজ

সুদানের প্রত্যন্ত এলাকায় একটি অনানুষ্ঠানিক সোনার খনি ধসে অন্তত ৮২ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা…

বাংলাদেশকে ‘নতুন’ পাকিস্তান বানাতে চায় কারা?

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঙালি…

দুই বছর ধরে কারাগারে শ্যামল দত্তসহ সাংবাদিকরা, মুক্তির দাবি

দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তসহ কয়েকজন সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করেছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au