মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করতে চান আইসিসি
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যেও নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। আদালতের প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন,…
মেলবোর্ন, ৫ জানুয়ারি- হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে পুলিশের কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা নেতা মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্ষোভ ও চাপের মুখে তার জামিনে মুক্তি ঘিরে দেশে আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

পাঁচই অগাস্টের অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচং থানা থেকে গভীর রাতে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। গত ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভেতরে বসে তিনি ওসি আবুল কালামের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলছেন এবং একপর্যায়ে বানিয়াচং থানা পোড়ানো ও এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে হত্যা করার প্রসঙ্গ টানেন। ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারাই সরকার গঠন করেছেন এবং পুলিশ তাদের প্রশাসনের অংশ।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে শনিবার বিকেলে মাহদী হাসানকে পুলিশের কাজে বাধা ও হুমকির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। এরপরই হবিগঞ্জ ও ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। সদর থানার সামনে রাতভর অবস্থান কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে আলটিমেটামও দেওয়া হয়।

মাহদী হাসানের জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গন থেকেই আনন্দ মিছিল বের করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা – কর্মীরা।
রোববার সকালে মাহদী হাসানকে হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। মুক্তির পরপরই তিনি সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে শহরে আনন্দ মিছিল করেন, যা নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়।
মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, এ ধরনের কথাবার্তার মাধ্যমে পুলিশকে হেয় করা কাম্য নয়।
“এ ধরনের কথাবার্তা বলে পুলিশকে হেয় বা দুর্বল প্রমাণিত করার চেষ্টা করলে তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক না” বলেন মি. মালিক।
তবে তিনি এটিও জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকলে কেবলমাত্র কথার ভিত্তিতে কাউকে আটক করা যায় না।
যদি কোনো ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তাহলেই তা আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে জানান আইনজীবী মি. মালিক।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান পুলিশের সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে এ কথা বলেছেন।
তাই এটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে গণ্য হবে না বলে মনে করেন তিনি।
“এটা আইনের চোখে অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক নয়,” বলেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।

ছবির উৎস,Screen Grab
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহদী হাসানের ‘স্বীকারোক্তি’ ও গ্রেফতারের পরে মুক্তির দাবিতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর তার নেতা-কর্মীদের থানার সামনে বিক্ষোভের ঘটনা প্রমাণ করে দেশে আইনের শাসন একেবারেই দুর্বল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি বা বাস্তবতার কাছে যদি আইনের শাসন সবসময় পদাবনত বা অবনত থাকে বা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা থাকবে না”।
এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয় বরং ঘটনাটির অন্তর্নিহিত প্রভাব অনেক ব্যাপক বলে মনে করেন মি. হক।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মানতে না চাওয়ার কারণেই ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা যা খুশি তাই করতে চায়। ফলে দেশে আইনের শাসন নেই বলেই ধারণা হয় সাধারণ মানুষের।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ” আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছি কিন্তু আইনি সংস্কৃতি তৈরি করা বা আইন মান্যকারী পরিবেশ বা জনগোষ্ঠী তৈরি করা এই বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে আমরা মানতে চাচ্ছি না।”
মি. হক মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান ঘরোয়া কোনো পরিবেশে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার কথা বলেননি, বরং যে পরিবেশে বলেছেন, তা ১৬৪ ধারার চেয়ে কোনো অংশে কম না।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় দলটির অঙ্গসংগঠনগুলোর এ ধরনের প্রভাব খাটানোর নজির দেখা গেছে।
পাঁচই অগাস্টের পরে বিভিন্ন জায়গাতে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মবোক্রেসির মতো নানা ধরনের অপরাধ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ” এখন সেই জায়গাতে এসে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা বা নিজেদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত না দিলে মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসার যে অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা, যারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন তখন এ ব্যাপারগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন যেমন তৈরি হয়, তখন এটাও তৈরি হয় যে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? “
রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মি. হক।
এ বিষয়ে কথা হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার, শায়েস্তাগঞ্জ থানা ও বানিয়াচং থানার ওসিসহ অন্তত চারজনকে ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি তারা।
পরে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর উইংয়ের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের মোবাইলে ফোন করলেও রেসপন্স করেননি তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ও চাপের কারণে আইন প্রয়োগে শিথিলতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে আস্থা কমে যায়। মাহদী হাসানের গ্রেফতার ও দ্রুত মুক্তির ঘটনা তাই একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইস্যুর বাইরে গিয়ে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সূত্র:বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au