বাংলাদেশ

নিওলিবারালিজম ও ধর্মীয় উগ্রবাদ: বাংলাদেশের ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ

  • 7:47 pm - January 13, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২০ বার
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ইউনুসের অধীনে নিওলিবারাল অর্থনীতি ও ধর্মীয় উগ্রবাদের জোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে গভীর সংকটে ফেলছে। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৩ জানুয়ারি: শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর বাংলাদেশে একটি তথাকথিত নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে আসেন নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে ইউনূস যে পথ বেছে নিয়েছেন, তা ক্রমেই বাংলাদেশকে এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক ও আদর্শিক পথে ঠেলে দিচ্ছে।

ইউনূস প্রশাসনের টিকে থাকার কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি জোট—একদিকে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী নিওলিবারাল অর্থনৈতিক স্বার্থ। এই দুই শক্তির সঙ্গে আপস করেই সরকার নিজেকে টিকিয়ে রাখছে।

এর প্রথম স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ (জেআইবি)–এর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকা এই কট্টর ডানপন্থী দলটি এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার। একই সঙ্গে সরকার আইএমএফের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী একটি কঠোর নিওলিবারাল অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বাম ও মধ্য-বাম রাজনৈতিক শক্তিকে পদ্ধতিগতভাবে প্রান্তিক করে ইউনূস প্রশাসন কার্যত বাংলাদেশকে একটি অতি-ডানপন্থী শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে রক্ষণশীলতা প্রাধান্য পাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং খেলাফত মজলিসসহ আরও কট্টর সংগঠনগুলো সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। বিনিময়ে তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতিনীতিতে ছাড় আদায় করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক অপসারণ এবং নারীর অধিকারের ওপর বিধিনিষেধের মতো দাবিগুলোর প্রতি নীরব সহনশীলতা।

এই জোট বাংলাদেশে একটি গভীর আদর্শিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। ইসলামপন্থী নেতারা সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি দুর্বল করার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করছেন।

এর পাশাপাশি, স্বাধীন গণমাধ্যম ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির ওপর হামলা বাড়ছে। দেশের প্রধান বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা, একটি শীর্ষ সংগীত বিদ্যালয় এবং উদীচীর মতো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো হামলার শিকার হয়েছে।

গত ১৭ মাসে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর ওপর প্রায় ২,৫০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর একটি ভয়াবহ ঘটনায় এক তরুণ হিন্দুকে পিটিয়ে হত্যা করে তার দেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সমালোচকদের মতে, ইউনূস সরকারের ইসলামপন্থী সমর্থনের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে দুর্বল করছে এবং সমাজকে বিপজ্জনকভাবে বিভক্ত করছে।

অর্থনীতি: সংকটের দ্বারপ্রান্তে

অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আইএমএফের পরামর্শে কঠোর মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

  • মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯%, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪%

  • খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪.২ ট্রিলিয়ন, যা ব্যাংকিং খাতকে ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে

  • শিল্পখাত সংকুচিত, কারখানা বন্ধ, বেকারত্ব বাড়ছে

  • দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ কর আরোপ ও সংকোচনমূলক নীতি এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন বিনিয়োগ কমছে ও আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। ফলে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪%-এর নিচে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল।

ইউনূস সরকার বিদেশি বিনিয়োগের কথা বললেও বাস্তবে যা এসেছে তা মূলত বহুজাতিক কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অর্থ স্থানান্তর।

গণতন্ত্রের ওপর আঘাত

ইউনূস সরকার বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বাম ও মধ্য-বাম রাজনীতিকে দমন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালেই ৪ লাখের বেশি রাজনৈতিক কর্মী কারাগারে এবং ২০০ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে—যাদের বেশিরভাগই উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর হাতে নিহত।

এই পরিস্থিতিকে অনেকে “জাকার্তা মেথড”–এর পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন—ধর্মীয় উগ্রবাদকে ব্যবহার করে প্রগতিশীল শক্তিকে ধ্বংস করা এবং অর্থনৈতিক শোষণকে বৈধতা দেওয়া।

নোবেল মানেই দায়মুক্তি নয়

বিশ্বমঞ্চে নোবেল বিজয়ী হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস সম্মানিত হলেও, ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়—মিয়ানমারের অং সান সু চিও নোবেল বিজয়ী ছিলেন, অথচ রোহিঙ্গা গণহত্যার সময় তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।

নোবেল পুরস্কার কাউকে নৈতিক দায়মুক্তি দেয় না।

প্রশ্ন উঠছে—এই ধরনের একটি কর্তৃত্ববাদী, উগ্রবাদী ও নিওলিবারাল শক্তিতে বন্দী সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে?

বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির উচিত এখনই এই শাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে কথা বলা।

বিদিত এল ডে-এর লেখা | অনুবাদ: OTN Bangla

মূল উৎস: aliran.com

এই শাখার আরও খবর

২০২৭ সাল হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের বছর

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে এবং ২০২৭ সাল দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন লেখক সৈয়দ বদরুল আহসান। তাঁর মতে,…

১৫০০ টাকায়ও কাজ করেছেন ঐশ্বরিয়া, এখন শত কোটি টাকার মালিক

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : একসময় একটি ম্যাগাজিনের ফ্যাশন ক্যাটালগের মডেল হিসেবে কাজ করে পেয়েছিলেন মাত্র ১ হাজার ৫০০ রুপি। সেই তরুণীই আজ বলিউডের আন্তর্জাতিক পরিচিত…

তাহসিফের মৃত্যুতে নতুন রহস্য, সিসিটিভিতে তরুণীর সঙ্গে যাওয়ার তথ্য

বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। মৃত্যুর আগে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা…

জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে সহিংসতা, দোকানপাটে লুটপাট ও পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো, সামাজিক সেবার সংকোচন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রতিবাদে জার্মানির বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার তরুণ।…

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে ইরান?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ইরানের যোগ দেওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু…

এআইচালিত সাইবার হামলায় অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সেবা অচল হওয়ার আশঙ্কা

ওটিএন বাংলা: সংস্থাটির ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক সাইবার হুমকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি সাইবার নিরাপত্তার পরিবেশ বদলে দিচ্ছে। রাষ্ট্রসমর্থিত হ্যাকার ও…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au