ভারত গত শুক্রবার বাংলাদেশ থেকে কিছু ” উগ্র চরমপন্থী” মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে আবারও বলেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু-সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় ভারত চিন্তিত। হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা প্রদান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, “নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বাংলাদেশের সাথে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশের জনগণের সাথে আমাদের সম্পর্কের একটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থানীয় সমস্যার কারণে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ব্যাহত হয়েছে। তাই সরকারি আলোচনায় প্রকল্প পোর্টফোলিও যৌক্তিকীকরণ এবং পারস্পরিকভাবে সম্মত প্রকল্পগুলিকে সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত সমর্থন এবং অনুমোদন পাওয়া গেলে আমরা এই প্রকল্পগুলি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছি,” বলেছেন মুখপাত্র।”
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে ভারত বারবার জোর দিয়েছে যে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সুরক্ষা প্রদান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব।
ব্রিফিংয়ে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিপোর্ট করা ২৩৭৪টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২৫৪টি ঘটনা পুলিশ দ্বারা যাচাই করা হয়েছে। আর এই ১২৫৪টি ঘটনার ৯৮ শতাংশই হামলাই রাজনৈতিক চরিত্রের বলে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।”
“এই ধরনের কোনও হামলাকে রাজনৈতিক বলে চিহ্নিত না-করে সব হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার সব ঘটনাতেই দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে, এটাই আমরা আশা করব”, আরও বলেন রণধীর জয়সওয়াল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা আশা করি বাংলাদেশ হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার সমস্ত অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করবে, এমন কোনও বিভেদ না করে।”
জয়সওয়াল বলেছেন যে ভারত একটি “স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশ” সমর্থন করে, যেখানে সমস্ত বিষয় গণতান্ত্রিক উপায়ে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সমাধান করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘খুবই ভালো’ আছে বলে দাবি করেছিলেন। তবে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে এই দাবির প্রত্যক্ষ বা ‘অন রেকর্ড’ কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। মুখপাত্র রন্ধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে যে সমালোচনা করেছেন, তা থেকে স্পষ্ট যে ভারত প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস তার সাক্ষাৎকারে আরও অভিযোগ তুলেছিলেন যে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বিদেশ থেকে প্ররোচনা দিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ‘আনসেটল’ বা অস্থির করতে চাইছে। তবে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় একটি সূত্র বিবিসি বাংলাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তারা এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। সূত্রটি বলেছেন, “উনি কি শেখ হাসিনার কথা বলতে চাইছেন? তাহলে নাম করে পরিষ্কার বলছেন না কেন?”
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ভারত প্রধান উপদেষ্টার অভিযোগগুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং এ বিষয়ে তাদের অবস্থান ভিন্ন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ে আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ভারতের মূল্যায়ন প্রধান উপদেষ্টার দাবির চেয়ে ভিন্ন।
শুক্রবার দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্নে ভারত সরকার যা যা বলেছে – তার কোনওটাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য প্রশংসাসূচক নয়।
সম্প্রতি ভারতের আমন্ত্রণে দ্বিপাক্ষিক স্তরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে সব বৈঠক হয়েছে, সেগুলোকেও ‘রুটিন বৈঠক’ বলে বর্ণনা করে সেগুলোর গুরুত্ব খাটো করে দেখাতে চেয়েছে ভারত। অর্থাৎ, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য ভারতের দিক থেকেও তাগিদ আছে, কিন্তু বিষয়টাকে যাতে সেভাবে ব্যাখ্যা না করা হয়, মুখপাত্র রন্ধীর জয়সওয়ালের কথাতে পরিষ্কার সেই ইঙ্গিত ছিল।