মিশনের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার মহাকাশযান থেকে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকক্ষে জানিয়ে দেন, তারা যে দৃশ্য দেখছেন তা “বর্ণনার বাইরে”। ছবিঃ নাসা
মেলবোর্ন, ৭ এপ্রিল- চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করা নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা ইতিহাস গড়েছেন। তারা পৃথিবী থেকে এমন দূরত্বে পৌঁছেছেন, যা কোল্ড ওয়ারের সময়কার অ্যাপোলো মিশনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে মহাকাশের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তারা, যা ‘ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ওরিয়ন মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছে যায়, যা মানুষের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দূরত্ব। এর আগে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ মিশন প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার মাইল দূরত্বে পৌঁছেছিল। আর্টেমিস-২ সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়ে।
মিশনের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার মহাকাশযান থেকে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকক্ষে জানিয়ে দেন, তারা যে দৃশ্য দেখছেন তা “বর্ণনার বাইরে”।
তিনি বলেন, এই দৃশ্যের বৈজ্ঞানিক মূল্য হয়তো নেই, কিন্তু মানুষ সম্ভবত এমন দৃশ্য দেখার জন্য বিবর্তিত হয়নি। কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানও একই ধরনের অনুভূতির কথা জানান। তিনি বলেন, যতক্ষণই দেখা হোক না কেন, চোখের সামনে থাকা দৃশ্যটি মস্তিষ্ক ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। এটি একেবারেই অবিশ্বাস্য ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা।

তখন ও এখন: ১৯৭২ সালে (ডানে) এবং ২০২৬ সালে (বামে) পৃথিবী।
মহাকাশযান ওরিয়নের জানালা দিয়ে তাকিয়ে নভোচারীরা লালচে একটি গ্রহ দেখতে পান, যা পরে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয় যে সেটি মঙ্গল গ্রহ। একই সময়ে দূরে একটি ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু দেখা গেলে সেটিকে শুক্র গ্রহ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে বলা হয়, এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এই অভিযানে নভোচারীরা একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণও পর্যবেক্ষণ করেন। প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে চলা এই সূর্যগ্রহণের সময় তারা সূর্যের করোনা বা বাইরের আলোকবলয় স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
গ্লোভার জানান, চাঁদের আড়ালে সূর্য ঢাকার পরও তার চারপাশে উজ্জ্বল আলোর বলয় তৈরি হয়, যা প্রায় পুরো চাঁদকে ঘিরে রাখে। একই সঙ্গে পৃথিবীর প্রতিফলিত আলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে সূর্য আড়াল হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা দেখা যায়। তিনি বলেন, পৃথিবী এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, আর তার সামনে যেন ভাসমান অবস্থায় ছিল চাঁদ।

ওরিয়ন মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছে যায়। ছবিঃ নাসা
এই সময় মহাকাশযানের সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ মিনিটের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ নভোচারীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি, যদিও তাদের পাঠানো তথ্য ও পর্যবেক্ষণ পৃথিবীতে পৌঁছাতে থাকে। পরে আবার যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
মিশনের অংশ হিসেবে চার নভোচারীকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি দল জানালার পাশে থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে, আরেকটি দল ভেতরে থেকে ক্যামেরা ও সেন্সরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। নাসা জানায়, এই অভিযানে ব্যবহারের জন্য নভোচারীদের একাধিক উন্নতমানের ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সূর্যগ্রহণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবি তোলা হয়েছে।

সোমবার মহাকাশযানটি চাঁদের অদৃশ্য বা দূরবর্তী অংশের উপর দিয়ে উড়ে যায়। ছবিঃ নাসা
এর আগে সোমবার মহাকাশযানটি চাঁদের অদৃশ্য বা দূরবর্তী অংশের উপর দিয়ে উড়ে যায়। প্রায় ছয় ঘণ্টার এই অভিযানে তারা চাঁদের সেই অংশ পর্যবেক্ষণ করেন, যা পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না। এই সময় তারা চাঁদের পৃষ্ঠে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে সৃষ্ট আলোর ঝলকও প্রত্যক্ষ করেন, যা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কখ এবং কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন অংশ নিচ্ছেন। তারা মহাকাশযানে বসে চাঁদের বিভিন্ন গহ্বরের নামকরণ নিয়েও আলোচনা করেন। একটি গহ্বরের নাম “ইন্টেগ্রিটি” এবং আরেকটির নাম ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রীর নামে “ক্যারল” রাখার প্রস্তাব দেন তারা।
চাঁদের অপর পাশে পৌঁছানোর সময় মহাকাশযানটি প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢেকে যায় এবং পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সময় চাঁদ পৃথিবী ও মহাকাশযানের মাঝে অবস্থান করায় যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তবে এই বিরল অবস্থান থেকে নভোচারীরা চাঁদের কিনারা দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশের এক অসাধারণ দৃশ্য ধারণ করেন।
একই সঙ্গে তারা এমন একটি দৃশ্যও ধারণ করেন, যেখানে দূরে ছোট্ট পৃথিবীকে চাঁদের দিগন্তে অস্ত যেতে এবং আবার উদিত হতে দেখা যায়। এটি পৃথিবী থেকে দেখা চন্দ্রোদয়ের ঠিক বিপরীত এক অভিজ্ঞতা।

চার মহাকাশচারী। ছবিঃ সংগৃহীত
মিশনের শেষে নাসার বিজ্ঞানীরা নভোচারীদের ধন্যবাদ জানান। নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জানানো হয়, সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ পর্ব শেষ হয়েছে এবং এখন তারা গত সাত ঘণ্টায় ধারণ করা সব ছবি ও তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর কাজ শুরু করবে।
উল্লেখ্য, আর্টেমিস কর্মসূচি অ্যাপোলো মিশনের উত্তরসূরি হিসেবে চাঁদে পুনরায় মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে পুনরায় নভোচারী অবতরণ করানো এবং ভবিষ্যতে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযানের পথও সুগম করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স ও বিবিসি