বাংলাদেশ

দুদকের তদন্ত

নৌবাহিনী প্রধান ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের ব্যাপক দুর্নীতি

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসের সময়ে এসব ক্রয় ও চুক্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

  • 1:15 pm - April 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪২ বার
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান(বামে) এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান(ডানে)। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন। নর্থইস্ট নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত বহুকোটি টাকার চুক্তিতে অনিয়মের সঙ্গে এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসের সময়ে এসব ক্রয় ও চুক্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে কমিশনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের তদন্তে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন, তেল পরিবহন চুক্তি, দরপত্র নথি, ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য, কমিশন-সংক্রান্ত কাগজপত্র, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করেছে। পাশাপাশি মনিরুজ্জামান ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত আর্থিক নথি, আয়কর রিটার্ন এবং সম্পদের বিবরণও খতিয়ে দেখা হয়েছে।

২০২৫ সালের ১ জুলাই জারি করা আদেশে দুই সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করা হয় এবং একই বছরের ৭ জুলাইয়ের একটি নথিতে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারির আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রকল্প, চুক্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত তদন্ত চালানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর। ছবিঃ সংগৃহীত

তদন্তে বিভিন্ন প্রকল্প ও চুক্তিতে কাঠামোগত অনিয়ম, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কমিশনের মতে, বিস্তৃত তদন্তে আরও অনেক প্রভাবশালী সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয়ও সামনে আসতে পারে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রভাবশালী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গেছে।

নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামানের সময়ে চীন থেকে ক্রেন কেনার একটি বড় প্রকল্পে অনিয়ম ঘটে। সেখানে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকায় ছয়টি ক্রেন কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও একই মূল্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি ক্রেন কেনা হয়। এতে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই অনিয়মের তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। এতে বর্তমান ও সাবেক উভয় কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানের ভূমিকা মূলত নীতিনির্ধারণ ও পরামর্শ পর্যায়ে সীমিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া তদন্তে উঠে এসেছে, বিভিন্ন চুক্তি ও ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন মাধ্যমে পাচার করে বিদেশে নেওয়া হয়েছে এবং অফশোর আর্থিক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টাভিত্তিক ‘মুকুল করপোরেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একাধিক সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে, যাকে তদন্তকারীরা একটি আড়ালকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সন্দেহ করছেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ কাজী মুকুল।

নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ নিবন্ধিত থাকলেও অর্থের উৎস ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা গেছে।

আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামানের সময়ে চীন থেকে ছয়টি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রায় ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকায়। কিন্তু একই দামে শেষ পর্যন্ত চারটি জাহাজ কেনা হয়, যার ফলে প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি এখনও কমিশনের পর্যালোচনায় রয়েছে।

তদন্তের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও চারজন কর্মকর্তাকে যুক্ত করে তদন্ত দল সম্প্রসারণ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘোষিত বা বৈধ আয়ের সঙ্গে তাদের সম্পদ অর্জনের সামর্থ্যের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত মোহাম্মদ সাজিদ হাসান ও তানজিম হাসানের নামে থাকা সম্পদ, বাসস্থান ও মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নৌবাহিনী প্রধানের স্ত্রীর ভগ্নিপতির স্বামী হিসেবে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের নামও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দেশত্যাগ করে কাতারে একটি মার্কেট ক্রয় করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই সম্পত্তি তার নামে কেনা হলেও এর পুরো অর্থ নৌবাহিনী প্রধানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসান ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পূর্ণ অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হন।

এছাড়া মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট স্বাক্ষরিত প্রায় ১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার ‘অ্যানিম্যাল চ্যানেল কনজারভেশন ড্রেজিং’ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পে কাজ বণ্টন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন ও গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সামগ্রিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একটি অনানুষ্ঠানিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, যেখানে পারস্পরিক নির্ভরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে বড় প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন এবং চুক্তির শর্ত নির্ধারণে এসব অনিয়ম বেশি দেখা গেছে।

এই তদন্তে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিপিং খাতজুড়ে বিস্তৃত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের একটি জটিল চিত্র উঠে এসেছে, যা প্রশাসনিক কাঠামো ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এই শাখার আরও খবর

মার্কিন অবরোধ ভেঙে দক্ষিণের বন্দরে ইরানি জাহাজ, দাবি ইরানি সেনাবাহিনীর

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল-  ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন অবরোধ অমান্য করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বন্দরে সফলভাবে নোঙর করেছে। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে…

গ্লোবাল সাউথ গবেষকদের জন্য ২০২৬ সালে সম্পূর্ণ অর্থায়িত আন্তর্জাতিক ফেলোশিপের সুযোগ

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল-  নগরায়ন, উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক শহর রূপান্তর নিয়ে কাজ করা গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নিয়ে এসেছে ২০২৬ সালের আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল ফেলোশিপ।…

কঠোর নিরাপত্তা বিধিতে শ্রেণিকক্ষে ফিরল ইউএইর শিক্ষার্থীরা

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে কয়েক সপ্তাহ দূরশিক্ষণের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে লাখো শিক্ষার্থী। সোমবার, ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে স্কুল,…

যুদ্ধ ও ইন্টারনেট বন্ধে ইরানে জীবিকার ধস, সবচেয়ে বেশি বিপদে প্রান্তিক মানুষ

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- ইরানে চলমান সংঘাত ও ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার প্রভাব দিন দিন গভীর হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকায়।…

যুদ্ধবিরতি বাড়াতে অনাগ্রহ ট্রাম্প, তবু ইরানের সঙ্গে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সম্ভাব্য একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। ফার্গাস গ্রেগ, হানান…

চুক্তির দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তায় নতুন করে উদ্বেগ

মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। তবে একই সময়ে শান্তি আলোচনা এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au