শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল
মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সময় আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরেই এটি চালুর লক্ষ্য থাকলেও পরিচালনা চুক্তি সম্পাদন, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং প্রস্তুতিমূলক ধাপ মিলিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবে চালু হতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো অপারেশনাল ম্যানেজমেন্ট চুক্তি। এই চুক্তি নিয়েই মূলত জটিলতা তৈরি হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে আয়ের ভাগাভাগি, যাত্রী প্রস্থান ফি, আগাম অর্থ প্রদানসহ একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য এখনো সমাধান হয়নি।
সূত্র জানায়, জাপানি কনসোর্টিয়াম আয়ের ২৫ শতাংশ বেবিচককে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও বাংলাদেশ পক্ষ আরও বেশি অংশ দাবি করছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত নয় দফা বৈঠক হয়েছে, তবে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চুক্তি চূড়ান্ত করতে আরও অন্তত তিন মাস সময় লাগবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুরু হবে “অপারেশন রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার” বা ওআরএটি প্রক্রিয়া, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একটি নতুন টার্মিনাল চালুর আগে পরীক্ষামূলক প্রস্তুতির ধাপ। এই প্রক্রিয়াটি ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। সব মিলিয়ে প্রকৃত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনায় থাকবে জাপানের চারটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎস করপোরেশন এবং নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করপোরেশন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা দেখভাল করবে বেবিচক। পুরো টার্মিনালে প্রায় ছয় হাজার জনবল কাজ করবেন, যার মধ্যে প্রায় চার হাজার নিরাপত্তাকর্মী থাকবে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ধাপে ধাপে কাজ এগোচ্ছে। তিনি বলেন, দ্রুত টার্মিনাল চালু করা হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তাই সতর্কতা নিয়েই সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত নয় দফা আলোচনা হয়েছে। কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হলেও এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার এবং জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার মধ্যে ঋণ চুক্তি হয়েছে। ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে, বাকি অংশ ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাইকা।
এই ঋণের কিস্তি পরিশোধ চলতি বছরের জুন থেকে শুরু হবে। বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে, যা ২০৫৬ সাল পর্যন্ত চলবে। সরকারের পক্ষ থেকে আরও আগে কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর। প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই আধুনিক টার্মিনালে থাকবে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক এবং তিনটি ভিআইপি ডেস্ক।
চালু হলে টার্মিনালটির যাত্রী ধারণক্ষমতা বছরে ৮০ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। একই সঙ্গে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে।
বেবিচক জানিয়েছে, নতুন টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।