বাংলাদেশ

কোন পথে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা? 

পৃথক সচিবালয় বাতিলে নতুন করে বিতর্ক, আইনি লড়াই চলমান

  • 12:57 pm - April 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭২ বার
হাইকোর্ট। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন,  ২৯ এপ্রিল- বাংলাদেশে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাবে কীভাবে—এই প্রশ্ন নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে সেই পুরোনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে গঠিত পৃথক সচিবালয় বাতিলের পর আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। সরকারের দাবি, এটি প্রয়োজনীয় সংস্কারের অংশ; অন্যদিকে আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত সাম্প্রতিক এক আইনি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। ওই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবেও নির্বাহী বিভাগের বাইরে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার একটি কাঠামো পায়। এর আওতায় আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা কার্যক্রম শুরু করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে।

কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে সেই উদ্যোগ বাতিল করে। জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ওই অধ্যাদেশটি বাতিল করা হয়। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আবারও কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে একটি সংশোধনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এক মতবিনিময় সভায় বলেন, বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন থাকলেও অতীতে সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্বতা বজায় রাখতে পারেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সময়ে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি, ফলে সামগ্রিক কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন ছিল। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে সহায়ক হবে।

তবে এই অবস্থানের বিপরীতে জোরালো আপত্তি তুলেছেন আইনজীবীদের একটি অংশ। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এই দিনটিকে বিচার বিভাগের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য বড় ধাক্কা। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী প্রভাব বাড়তে পারে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ—পারস্পরিক পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় থাকাই স্বাভাবিক এবং এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে এই বিতর্কের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ‘মাসদার হোসেন মামলা’র ঐতিহাসিক রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার নির্দেশ দেয়। ওই রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ধারণা শক্ত ভিত্তি পায়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিচার বিভাগকে প্রশাসনিকভাবে আলাদা করার প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতের প্রশ্নটি তখন থেকেই আলোচনায় ছিল।

সাম্প্রতিক অধ্যাদেশ এবং তা বাতিলের ঘটনাকে সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকের মতে, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা শুধু সাংবিধানিক ঘোষণা নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামো, নিয়োগ প্রক্রিয়া, বাজেট নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার ওপর নির্ভর করে। পৃথক সচিবালয় সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল কি না—এই প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

এদিকে অধ্যাদেশ বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনি লড়াইও শুরু হয়েছে। চলতি মাসে কয়েকজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। হাইকোর্ট প্রাথমিকভাবে বিষয়টি সরাসরি নিষ্পত্তি না করে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রেখেছেন। একই সঙ্গে আদালত প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে না।

এর পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় আরও একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়ে বর্তমান সংসদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ এনেছেন। যদিও এই আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তবুও এটি বিষয়টির গুরুত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au