অস্ট্রেলিয়া

সিডনির বন্ডাই বিচে বন্দুক হামলা

বাবা-ছেলের গোপন জীবন থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড: কেমন ছিল সাজিদ আকরামের অজানা অধ্যায়

  • 5:47 pm - May 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫১ বার
বাবা-ছেলের গোপন জীবন থেকে রক্তক্ষয়ী হামলা: কেমন ছিল সাজিদ আকরামের অজানা অধ্যায়। ছবিঃ এবিসি নিউজ

মেলবোর্ন, ২ মে- বন্ডাই বিচে সংঘটিত ভয়াবহ হামলার পেছনের গল্পটি শুধু একটি সহিংস ঘটনার বিবরণ নয়, বরং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক জটিল মানসিক ও পারিবারিক প্রক্রিয়ার ফল। গোপনীয়তা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, পরিচয় আড়াল করে জীবনযাপন এবং অস্ত্রের প্রতি দীর্ঘদিনের আগ্রহ, এই সব মিলিয়ে সাজিদ আকরাম ও তার ছেলে নাভিদ আকরামের জীবন এক সময় এমন এক পথে মোড় নেয়, যার পরিণতি ছিল এই রক্তক্ষয়ী হামলা। তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বয়ান বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তাদের ব্যক্তিজীবনের ভেতরের অন্ধকার দিক, যা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে চরম সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।

নিজ পরিবারের সদস্যদের কাছেও সাজিদ আকরাম ছিলেন অস্বাভাবিকভাবে গোপনীয় একজন মানুষ। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘনিষ্ঠরাও প্রায় কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

তার অস্ট্রেলীয় শ্যালক মাইকেল(ছদ্মনাম) জানান, তিনি আজও জানেন না কীভাবে আকরামের সঙ্গে তার বোন ভেনেরার পরিচয় হয়েছিল। তার ভাষায়, আকরামের কোনো ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ছিল না, যা তাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল। মাইকেল আরও বলেন, “তার সঙ্গে কথা বলা খুব কঠিন ছিল।”

তিনি আরও জানান, আকরাম নিজের কাজ, বন্ধু বা ব্যক্তিগত আগ্রহ সম্পর্কে খুব কমই বলতেন।

তবে একটি ঘটনা তার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। বহু বছর আগে আকরাম হঠাৎ করে জানিয়েছিলেন তিনি বন্দুকের লাইসেন্স নিতে চান।

তিনি তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি বন্দুক দিয়ে কী করবে?”

আকরাম জবাব দিয়েছিলেন, “শিকার করতে যাব।”

মাইকেলের পাল্টা প্রশ্ন ছিল, “তুমি তো শিকারি নও।”

এই শিকার করার যুক্তিই পরবর্তী সময়ে তার জীবনের বড় একটি অংশে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে, যখন তিনি ও তার ছেলে নাভিদ আকরাম বন্ডিতে এক ভয়াবহ হামলায় জড়িত হন।

হামলার আগের বছরগুলোতে আকরাম তার ছেলেকে নিয়ে সিডনির পশ্চিমাঞ্চলের একটি গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ওই সম্পত্তির মালিক ছিলেন গ্রিসের সাবেক সেনাসদস্য, যিনি পরিচয় গোপন রেখে “জিমি” নামে পরিচিত হতে চান।

জিমি জানান, তিনি ভেবেছিলেন তারা শিয়াল শিকার করবে, কিন্তু বাস্তবে তারা কার্ডবোর্ডের টার্গেটে গুলি চালাত। তার ভাষায়, “আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি এত গুলি করছ কেন? এতে আমার পশুগুলো ভয় পাচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, আকরামের লক্ষ্য ছিল মূলত ফার্মের কিছু কুকুর, যেগুলোকে তিনি ক্ষতিকর বলে মনে করতেন।

এক পর্যায়ে আকরাম বলেছিলেন, “তুমি চাইলে আমি এখনই মেরে ফেলতে পারি।”

জিমি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তার সঙ্গে সেটিই ছিল আকরামের একমাত্র সরাসরি কথা। বেশিরভাগ সময় কথা বলতেন নাভিদ আকরাম, যদিও জিমি জানতেন না তারা বাবা–ছেলে। নাভিদ নিজেকে “বন্ধু” হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

শেষবার ওই খামার সফরে নাভিদ জানিয়েছিলেন, তাকে অসুস্থ দাদার দেখাশোনার জন্য সিডনি ফিরতে হবে। পরে জানা যায়, ওই দাদা বহু বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন।

এই ধারাবাহিক গোপনীয়তা ও প্রতারণার প্রবণতা তদন্তকারীদের মতে আকরাম পরিবারকে অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠী থেকে আলাদা করে তোলে। এর ফলে তারা পশ্চিমা বিশ্বের খুব অল্প কিছু বাবা–ছেলে জুটির মধ্যে একটি হয়ে ওঠে, যারা একসঙ্গে সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয়।

তদন্তে প্রকাশিত তথ্য ও পরিচিতদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে অস্ট্রেলিয়ার ফরেনসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু আবুদ বলেন, বাবা–ছেলের সম্পর্ক এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সাজিদ কেমন বাবা ছিলেন? নাভিদ কীভাবে প্রভাবিত হয়েছিল? সে কি সহজে প্রভাবিত হওয়ার মতো ছিল, নাকি উল্টো দিক থেকে প্রভাব এসেছে?”

বন্দুক হাতে সাজিদ আকরাম ও তার ছেলে নাভিদ আকরাম। ছবিঃ সংগৃহীত

উচ্চ-মধ্যবিত্ত পটভূমি

সাজিদ আকরাম জীবনের বড় অংশ কাটান সিডনির ওয়েস্টার্ন রিজিওনে, তবে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভারতের হায়দরাবাদে একটি তুলনামূলক সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারে।

তার পরিবার একটি বড় পৈতৃক বাড়িতে থাকত, যা একটি মসজিদের কাছে অবস্থিত ছিল। প্রতিবেশীদের মতে, তার বাবা সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।

এই তদন্তে যুক্ত ভারতীয় সাংবাদিক তওকীর হুসাইন হায়দরাবাদে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, আকরাম ছিলেন উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, যেখানে ধর্মীয় কঠোরতার চেয়ে শিক্ষিত ও পেশাজীবী মুসলিম সমাজের প্রভাব বেশি ছিল।

প্রতিবেশীরা তাকে শান্ত, কম কথা বলা এবং সাধারণ স্বভাবের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করতেন।

১৯৯৬ সালে তিনি বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী তার ফলাফল ছিল গড়পড়তা।

তার ভাই শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বেশি সফল ছিলেন এবং চিকিৎসক হন। পরিবার পরবর্তীতে আরও উন্নত এলাকায় বড় বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়।

বন্ডাই বিচে হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে শ্রদ্ধা। ছবিঃ এবিসি নিউজ

গোপন বিয়ে

১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর সাজিদ আকরাম ভেনেরার সঙ্গে পরিচিত হন। ভেনেরা ছিলেন ইতালীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান, সিডনির স্ট্র্যাথফিল্ডে বড় হয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, ভেনেরার পরিবার ছিল গভীর ক্যাথলিক এবং খুব ঘনিষ্ঠ।

দুজনের সম্পর্ক দুই পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত তারা গোপনে সিভিল বিয়ের মাধ্যমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যা ভেনেরার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল।

গবেষকদের মতে, আকরাম শুরুতে চরমপন্থী ছিলেন না, বরং তার মানসিক পরিবর্তন পরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় এসে তিনি কম বেতনের কাজে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তারা ক্যাব্রামাটায় একটি বাড়ি কিনে সংসার শুরু করেন এবং সন্তানদের বড় করেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, আকরাম ছিলেন নিয়ন্ত্রণকারী ও একাকী স্বভাবের মানুষ। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের আত্মীয়দের কাছ থেকে দূরে রাখতেন। ভেনেরাকে অনেকে “স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকা” নারী হিসেবে বর্ণনা করেন।

এক ঘটনায় দেখা যায়, পরিবারের কেউ মদ নিয়ে এলে ভেনেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, কারণ তিনি ভয় পান তার স্বামী বিষয়টি জানতে পারলে ক্ষুব্ধ হবেন।

মাইকেলের মতে, আকরাম ছিলেন “ম্যানিপুলেটিভ ও মিথ্যাবাদী”।

ছেলের জীবন

নাভিদ আকরাম শুরুতে ইটের কাজ শেখেন এবং কর্মক্ষেত্রে ভালো পারফর্ম করেন। সহকর্মীরা তাকে পরিশ্রমী ও বিনয়ী হিসেবে দেখতেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বাবার প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

২০১৯ সালে বাবা–ছেলে একসঙ্গে মসজিদে যেতেন এবং ধর্মীয় কার্যক্রমে যুক্ত হন। পরে কিছু চরমপন্থী ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন বলে জানা যায়।

এরপর তারা নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারিতে আসে, তবে তখন কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এক সাবেক গোয়েন্দা দাবি করেন, আকরাম আইএসের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, যদিও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রণকারী ও বিচ্ছিন্ন মানসিকতার বাবা থাকলে সন্তান সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।

অস্ত্র, বিচ্ছিন্নতা ও শেষ অধ্যায়

পরবর্তীতে তারা অস্ত্র লাইসেন্স নেয় এবং গুলি চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু করে। ধীরে ধীরে তারা পরিবার থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সম্পর্ক ভেঙে যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্পর্ক ভাঙন এবং মানসিক অস্থিরতা এমন ব্যক্তিত্বকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। শেষ পর্যায়ে তারা একটি ভিডিও রেকর্ড করে, যেখানে চরমপন্থী বক্তব্যের অভিযোগ ওঠে।

এরপর তারা ফিলিপাইন সফরে যায় এবং দ্রুতই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসে।

২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর বন্ডাই বিচে হামলা। ছবিঃ সংগৃহীত

২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর বন্ডাই বিচে একটি ইহুদি উৎসব চলাকালে তারা দুজন হামলা চালায়। এই হামলায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুসহ ১৫ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন এবং আরও অন্তত ২৯ জন আহত হন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন হামলাকারীদের একজন সাজিদ আকরাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের গোপন পরিকল্পনা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং বাবা–ছেলের ঘনিষ্ঠ মানসিক জোট এই হামলার পথ তৈরি করে দেয়।

সূত্রঃ এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

এক বছর পর আবার চলল এক্সপিটি, ঐতিহ্যবাহী ‘ক্যান্ডি স্ট্রাইপ’ রঙে ফিরল আইকনিক ট্রেন

মেলবোর্ন, ২ মে- বড় ধরনের সংস্কার শেষে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের এক্সপ্রেস প্যাসেঞ্জার ট্রেন (এক্সপিটি) আবারও সিডনি থেকে গ্রাফটন রুটে যাত্রা শুরু করেছে। নিউ সাউথ…

সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ এমপির শপথ রবিবার

মেলবোর্ন, ২ মে- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত ৪৯ জন সংসদ সদস্য (এমপি) আগামী রবিবার (৩ মে) শপথ গ্রহণ করবেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়…

ফিক্সিং ঠেকাতে ডিপিএলের ড্রেসিংরুমে ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ

মেলবোর্ন, ২ মে- দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল) শুরুর আগে ম্যাচ ফিক্সিং প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট…

কারাবন্দি থেকে গৃহবন্দি হলেন সু চি

মেলবোর্ন, ২ মে-  মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চি-কে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক সরকার। তবে তার পরিবার…

কংগ্রেস এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সাড়ে ৮ বিলিয়নের অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ২ মে-  মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর কাছে প্রায় ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা নতুন করে…

ইউনিসেফ বাদে ভ্যাকসিন কেনা, ঝুঁকির সতর্কবার্তা সত্ত্বেও সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার

মেলবোর্ন, ২ মে- ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফ-এর মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au