বিশ্ব

৭০ এমপির পদত্যাগ দাবি

পদত্যাগের চাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, নতুন নেতৃত্বের দাবি

  • 3:31 pm - May 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৮ বার
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ১২ মে- যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদ টিকিয়ে রাখতে চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বড় ধরনের ভরাডুবির পর দলটির ভেতরেই তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, মন্ত্রিসভায় বিভক্তি এবং সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য বিরোধিতার মধ্যে আগামী ২৪ ঘণ্টাকে স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ২০ শতাংশ ভোট হারায়। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই দলের ভেতরে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এখন পর্যন্ত লেবার পার্টির ৭০ জনের বেশি এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। একইসঙ্গে ছয়জন মন্ত্রীর সহকারীও পদত্যাগ করেছেন।

মঙ্গলবার সকালে ব্রিটিশ সময় অনুযায়ী স্টারমারের মন্ত্রিসভার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে তার নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্ত্রিসভাও বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। একাংশ চান তিনি দায়িত্বে থাকুন, অন্য অংশ দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

পদত্যাগের চাপের মধ্যেও লড়াইয়ের ঘোষণা

চাপের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার ইঙ্গিত দেননি কিয়ার স্টারমার। সোমবার লন্ডনে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ব্রিটেনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জনগণের হতাশা রয়েছে এবং অনেকেই তার ওপরও অসন্তুষ্ট। তবে সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।

স্টারমার বলেন, “আমি জানি মানুষ ব্রিটেনের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ। রাজনীতি নিয়েও তারা বিরক্ত। অনেকেই আমার প্রতিও অসন্তুষ্ট। আমি জানি আমাকে নিয়ে সন্দেহ আছে, তবে আমি সেই সন্দেহ ভুল প্রমাণ করব।”

তিনি আরও বলেন, তার সরকার আরও ভালোভাবে কাজ করবে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

মন্ত্রিসভাতেও ভাঙনের আভাস

স্টারমারের ঘনিষ্ঠ মন্ত্রীদের মধ্যেও অনেকে এখন তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ কয়েকজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা ছাড়ার সময়সূচি ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রথমে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া লেবার এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট। তিনি নিজেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করার হুমকি দিয়েছিলেন। পরে সে অবস্থান থেকে সরে এলেও এখনো তিনি সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্টারমারের সরে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন।

লেবার এমপি জনাথন হিন্ডার বিবিসিকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত পদ ছাড়তেই বাধ্য হবেন। এই পরিস্থিতি থেকে কোনো প্রধানমন্ত্রী টিকে থাকতে পারেন না।”

স্টারমারের ওপর আস্থা হারানোর কথা উল্লেখ করে একাধিক মন্ত্রীর সহকারী পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে পরিবেশমন্ত্রীর সহকারী টম রাটল্যান্ড পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির মধ্যেই নয়, পুরো দেশের কাছেই কর্তৃত্ব হারিয়েছেন এবং তা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদত্যাগ স্টারমারের নেতৃত্বের সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার-এর নীতিনির্ধারণী দপ্তরের সাবেক সদস্য নিক রাউলি বলেন, কিয়ার স্টারমারের প্রতি মানুষের আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে।

তার মতে, স্টারমারকে দীর্ঘদিন এমন একজন দায়িত্বশীল ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল যিনি খুঁটিনাটি বিষয়ে দক্ষ। কিন্তু এখন লেবার পার্টির ভেতর এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে, “কিয়ার স্টারমারের প্রয়োজনীয়তা কী?”

রাউলি বলেন, বেশ কিছু নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসন-কে নিয়োগ এবং পরে তাকে ঘিরে বিতর্ক বড় ধাক্কা দিয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিপুল জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন স্টারমার। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক নীতিগত ভুল, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে থাকে।

ব্রিটিশ জনগণ এখনো দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে পারেননি স্টারমার।

তবে ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর চাপের মুখেও কঠোর অবস্থান নেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি কিছু প্রশংসা পেয়েছিলেন।

গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি বড় ধাক্কা খায়। ডানপন্থি জনতাবাদী দল রিফর্ম ইউকে ব্যাপক সাফল্য পায়। একইসঙ্গে বামঘেঁষা গ্রিন পার্টিও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। ওয়েলসের পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রণ হারায় লেবার। স্কটল্যান্ডেও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির বিরুদ্ধে ভালো ফল করতে ব্যর্থ হয় দলটি। বিশেষ করে নাইজেল ফারাজ-এর নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের উত্থান ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

বর্তমানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি সংখ্যা ৪০৩। দলীয় নিয়ম অনুযায়ী, নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করতে হলে কমপক্ষে ৮১ জন এমপির সমর্থন প্রয়োজন।

ক্যাথরিন ওয়েস্ট জানিয়েছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবিতে তিনি এমপিদের সমর্থন সংগ্রহ করছেন।

তবে স্টারমার সতর্ক করে বলেছেন, কনজারভেটিভদের মতো নেতৃত্ব সংকটে জড়িয়ে পড়লে লেবার পার্টিকে জনগণ কখনো ক্ষমা করবে না। ২০২২ সালে মাত্র চার মাসে তিনজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের কারণে কনজারভেটিভ পার্টি বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে।

স্টারমারের ঘনিষ্ঠ দুই মন্ত্রী, পরিবেশমন্ত্রী স্টিভ রিড এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি সোমবার রাতে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

স্টিভ রিড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “এখন নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে শুধু বিশৃঙ্খলাই বাড়বে। কনজারভেটিভদের সময় কী হয়েছিল আমরা দেখেছি। তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।”

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিয়ার স্টারমারের সামনে এখন অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

উৎসবের মঞ্চে ঐতিহ্য ও মানবিকতার মেলবন্ধন, ‘মহাশক্তি সম্মান’-এ স্বীকৃতি ২৫ দুর্গাপুজোর

দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক অবদান ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিতে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ২৫টি দুর্গাপুজো কমিটিকে ‘মহাশক্তি সম্মান’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ‘উই আর দ্য কমন…

পারিবারিক বন্ধুর হামলায় পা হারালেন অস্ট্রেলিয়ার নারী এমপি, সর্বশেষ যা জানা যাচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ায় স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্য হেলেন হেইন্সকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে হামলাকারীর পরিচয় ঘিরে। ৬৫ বছর বয়সী এই এমপির ওপর…

ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা

ইরানে আবারও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ…

যুদ্ধ এড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল পাকিস্তান ও কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে…

বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন

শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস, ঢাকের মধুর বাদ্য আর চারদিকে উৎসবের আমেজ—এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।…

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au