ভারতে লাফিয়ে বাড়ল স্বর্ণ ও রুপার দাম
মেলবোর্ন, ১৩ মে- ভারতে স্বর্ণ ও রুপার আমদানি শুল্ক বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের পর দেশটির বাজারে মূল্যবান এই দুই ধাতুর দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।…
মেলবোর্ন, ১৩ মে- ১৮ ডিসেম্বর ২০২২। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরে তখন উত্তেজনায় টগবগ করছে পুরো বাংলাদেশ। রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের টিএসসি প্রাঙ্গণে বিশাল পর্দায় দেখানো হচ্ছিল আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যকার মহারণ। খেলা শুরুর পর লিওনেল মেসি প্রথম গোল করতেই হাজারো মানুষের কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনিত হয়েছিল ‘গো-ও-ওল’। শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে ছাদ, ক্লাব থেকে মাঠ—সব জায়গাতেই ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা।
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে এই আবেগ নতুন কিছু নয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় ফুটবল দর্শকগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই উৎসব। ২০২২ সালে সেই উন্মাদনা বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফারও নজর কেড়েছিল। ঢাকার বিশ্বকাপ উন্মাদনার কয়েকটি ছবি নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে ফিফা লিখেছিল, “ফুটবলের মতো আর কিছুই মানুষকে একত্রিত করতে পারে না।”

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। ফাইল ছবি
কিন্তু চার বছর পর, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তা। আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ বাংলাদেশের দর্শকরা আদৌ টেলিভিশনে বা অনলাইনে দেখতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বাংলাদেশ অঞ্চলের জন্য পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড। বাংলাদেশি কোনো টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সম্প্রচারমাধ্যমকে তাদের কাছ থেকেই স্বত্ব কিনতে হবে। কিন্তু স্বত্বমূল্য এত বেশি যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতই এখন পর্যন্ত পিছিয়ে আছে।
বিটিভির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য স্প্রিংবক প্রায় ১৫১ কোটি টাকা দাবি করেছে। কর ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে তা প্রায় ২০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছাবে। শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থের অর্ধেক পরিশোধ করতে হবে। এই প্যাকেজের আওতায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, ফাইনালসহ মোট ১০৪টি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার এবং হাইলাইটস দেখানোর সুযোগ রয়েছে।
বিটিভি অতীতের প্রতিটি বিশ্বকাপ সম্প্রচার করেছে। তবে এবারের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৮ সালে ‘প্যাকেজ নীতিমালা’র আওতায় কোনো সরাসরি অর্থ ব্যয় ছাড়াই বিশ্বকাপ দেখাতে পেরেছিল রাষ্ট্রীয় এই চ্যানেল। কিন্তু ২০২২ সালে সেই নীতিমালা বাতিল হয়ে গেলে শেষ মুহূর্তে সরকারের বিশেষ বরাদ্দে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল বিটিভি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এবারও প্রথমে স্প্রিংবক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিটিভির কাছে পাঠায়। বিটিভি আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়। এত বিপুল অর্থের কারণে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে সরকার।
বিটিভির কর্মকর্তারা জানান, পরে ফিফার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বিনা মূল্যে অথবা কম মূল্যে সম্প্রচারের কোনো সুযোগ আছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। এ বিষয়ে ফিফাকে একাধিক ই-মেইলও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারত ও চীনেও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফিফাও স্বীকার করেছে, সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে বেসরকারি খাত থেকেও খুব বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সম্প্রচার ও ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কারণ হিসেবে তারা বলছে, এবারের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বাংলাদেশ সময় গভীর রাত ও ভোরে অনুষ্ঠিত হবে। এতে দর্শকসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকতে পারে। পাশাপাশি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপন পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই।
২০২২ সালে বিশ্বকাপের ডিজিটাল স্ট্রিমিং করেছিল ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফি। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। কারণ, এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগের বিপরীতে লাভের নিশ্চয়তা নেই।
নাগরিক টিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান কামরুজ্জামান বাবু বলেন, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বিদেশি কোনো চ্যানেল অন্য দেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার করতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান সম্প্রচার স্বত্ব না কিনলে দর্শকদের বৈধভাবে খেলা দেখার সুযোগ থাকবে না।
তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজছে।
অন্যদিকে স্বত্বধারী প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক বলছে, তারা এখনো আলোচনায় আগ্রহী। প্রতিষ্ঠানটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষের কথা বিবেচনা করে গ্রহণযোগ্য মুনাফায় সমাধানে পৌঁছাতে তারা প্রস্তুত।
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র এক মাসের মতো সময় বাকি। অথচ এখনো সম্প্রচার নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ দর্শকদের মধ্যে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ফাহাদ করিম বলেন, “বাংলাদেশ ফুটবলপ্রেমী দেশ। এখানে বিশ্বকাপ দেখানো হবে না, এটা চিন্তাও করা যায় না। যেকোনো উপায়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিশ্চিত করতে হবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় যত গড়াবে, সমাধানের পথ তত জটিল হয়ে উঠবে। কারণ, সম্প্রচার প্রযুক্তি, বিজ্ঞাপন, বিপণন এবং সম্প্রচারসূচি প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আসর থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au