বাংলাদেশ

মতামত-সরদার সেলিম রেজা

পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে রাষ্ট্র বা সরকারের করণীয়

  • 1:41 pm - May 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৩৮ বার
পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে রাষ্ট্র বা সরকারের করণীয়। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২১ মে- একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা মাপা হয় তার শিশুরা কতটা নিরাপদ, তা দিয়ে। অথচ ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশে যে অরাজকতা নেমে এলো, তার প্রথম শিকার হলো সেই শিশুরাই। বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, অপুষ্টি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, হাম এবং টিকা না পাওয়ার কারণে পরবর্তী এক বছরে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জ্বলন্ত দলিল।

নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে এনে যে অন্তর্বর্তী প্রশাসন ক্ষমতা নিল, তাদের সামনে প্রথম কাজ ছিল শৃঙ্খলা ফেরানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। মব ভায়োলেন্স, অগ্নিসংযোগ, থানা-হাসপাতাল-ইউনিয়ন পরিষদে হামলা, সরকারি রেকর্ড পোড়ানো—সব মিলে রাষ্ট্রযন্ত্র অচল হয়ে পড়ল। স্বাস্থ্যকর্মীরা কর্মস্থলে যেতে ভয় পেলেন, টিকার কোল্ড চেইন ভেঙে পড়ল, ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। যে শিশুটি হামের টিকা পেলে বাঁচত, সে বিনা চিকিৎসায় মারা গেল।

রাষ্ট্রের করণীয় প্রথমত ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টিকাদান কেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স—এসবকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখা। কিন্তু মাঠে দেখা গেল উল্টো চিত্র। স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, হাসপাতাল লুট, টিকার বাক্স ভাঙচুর। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলো আবার ফিরে এলো। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি বারবার চিঠি দিয়ে বলেছে, শিশু টিকাদান কর্মসূচি চালু না করলে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে। অথচ প্রশাসনের অগ্রাধিকারে শিশুর জীবন ছিল না।

দ্বিতীয় করনীয় ছিল জরুরি স্বাস্থ্য সেবা পুনরুদ্ধার। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার যে টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তা ছিল বিশ্বে প্রশংসিত। পোলিওমুক্ত বাংলাদেশ, নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাস, মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ রোল মডেল হয়েছিল। গ্রামের শেষ প্রান্তের শিশুটিও টিকা পেত। সেই কাঠামো ভেঙে পড়ার পর নতুন প্রশাসনের উচিত ছিল একে দ্রুত পুনর্গঠন করা। কিন্তু তা হয়নি। বরং স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, জনবল, লজিস্টিকস সবই অবহেলায় পড়ে রইল।

তৃতীয় করনীয় ছিল জবাবদিহি নিশ্চিত করা। হাজার হাজার মানুষ মিথ্যা মামলায় জেলে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনায় শিশুর মৃত্যু হলে তার দায় কেউ নেয় না। মব ভায়োলেন্সে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, লুটপাটকারীদের শাস্তি না দিয়ে রাষ্ট্র নিজেই অপরাধকে প্রশ্রয় দিল। অথচ একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হলো অপরাধীকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া।

চতুর্থ করনীয় ছিল আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগানো। ইউনিসেফ বারবার টিকা, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সহায়তা মাঠে পৌঁছাতে হলে স্থানীয় প্রশাসন সচল থাকা জরুরি। যখন প্রশাসনই নেই, তখন সহায়তাও কাগজে আটকে থাকে। ফল ভোগ করে শিশুরা।

শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনে বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্যে যে অগ্রগতি করেছিল, তা একদিনে হয়নি। ইপিআই কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক, মোবাইল হেলথ টিম—সব মিলে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে গিয়েছিল। সেই অর্জন রক্ষা করা ছিল নতুন সরকারের প্রথম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা মানে শিশুর জীবন নিয়ে খেলা।

রাষ্ট্র শিশুর অভিভাবক। সংবিধানেও রাষ্ট্রকে শিশুর জীবন, স্বাস্থ্য ও বিকাশ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। যখন রাষ্ট্র নিজেই সেই দায়িত্ব থেকে সরে যায়, তখন সমাজে নেমে আসে ভয়ের অন্ধকার। মব ভায়োলেন্স, লুটপাট, প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে কখনো একটি জাতি এগোতে পারে না।

পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—তোমরা কোথায় ছিলে, যখন আমরা মরছিলাম?
রাষ্ট্রের করনীয় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। দ্রুত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে, টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে হবে, মব ভায়োলেন্স বন্ধ করতে হবে, দোষীদের বিচার করতে হবে, এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে।

আমরা যদি আজও চুপ থাকি, তবে আগামীকাল আরও শিশুর কান্না শুনতে হবে। রাষ্ট্রের প্রথম ধর্ম মানুষ বাঁচানো। সেই ধর্ম ভুললে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সরদার সেলিম রেজা
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র

এই শাখার আরও খবর

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au