বাংলাদেশ

মতামত-সরদার সেলিম রেজা

পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে রাষ্ট্র বা সরকারের করণীয়

  • 1:41 pm - May 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৯৪ বার
পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে রাষ্ট্র বা সরকারের করণীয়। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২১ মে- একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা মাপা হয় তার শিশুরা কতটা নিরাপদ, তা দিয়ে। অথচ ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশে যে অরাজকতা নেমে এলো, তার প্রথম শিকার হলো সেই শিশুরাই। বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, অপুষ্টি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, হাম এবং টিকা না পাওয়ার কারণে পরবর্তী এক বছরে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জ্বলন্ত দলিল।

নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে এনে যে অন্তর্বর্তী প্রশাসন ক্ষমতা নিল, তাদের সামনে প্রথম কাজ ছিল শৃঙ্খলা ফেরানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। মব ভায়োলেন্স, অগ্নিসংযোগ, থানা-হাসপাতাল-ইউনিয়ন পরিষদে হামলা, সরকারি রেকর্ড পোড়ানো—সব মিলে রাষ্ট্রযন্ত্র অচল হয়ে পড়ল। স্বাস্থ্যকর্মীরা কর্মস্থলে যেতে ভয় পেলেন, টিকার কোল্ড চেইন ভেঙে পড়ল, ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। যে শিশুটি হামের টিকা পেলে বাঁচত, সে বিনা চিকিৎসায় মারা গেল।

রাষ্ট্রের করণীয় প্রথমত ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টিকাদান কেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স—এসবকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখা। কিন্তু মাঠে দেখা গেল উল্টো চিত্র। স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, হাসপাতাল লুট, টিকার বাক্স ভাঙচুর। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলো আবার ফিরে এলো। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি বারবার চিঠি দিয়ে বলেছে, শিশু টিকাদান কর্মসূচি চালু না করলে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে। অথচ প্রশাসনের অগ্রাধিকারে শিশুর জীবন ছিল না।

দ্বিতীয় করনীয় ছিল জরুরি স্বাস্থ্য সেবা পুনরুদ্ধার। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার যে টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তা ছিল বিশ্বে প্রশংসিত। পোলিওমুক্ত বাংলাদেশ, নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাস, মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ রোল মডেল হয়েছিল। গ্রামের শেষ প্রান্তের শিশুটিও টিকা পেত। সেই কাঠামো ভেঙে পড়ার পর নতুন প্রশাসনের উচিত ছিল একে দ্রুত পুনর্গঠন করা। কিন্তু তা হয়নি। বরং স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, জনবল, লজিস্টিকস সবই অবহেলায় পড়ে রইল।

তৃতীয় করনীয় ছিল জবাবদিহি নিশ্চিত করা। হাজার হাজার মানুষ মিথ্যা মামলায় জেলে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনায় শিশুর মৃত্যু হলে তার দায় কেউ নেয় না। মব ভায়োলেন্সে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, লুটপাটকারীদের শাস্তি না দিয়ে রাষ্ট্র নিজেই অপরাধকে প্রশ্রয় দিল। অথচ একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হলো অপরাধীকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া।

চতুর্থ করনীয় ছিল আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগানো। ইউনিসেফ বারবার টিকা, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সহায়তা মাঠে পৌঁছাতে হলে স্থানীয় প্রশাসন সচল থাকা জরুরি। যখন প্রশাসনই নেই, তখন সহায়তাও কাগজে আটকে থাকে। ফল ভোগ করে শিশুরা।

শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনে বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্যে যে অগ্রগতি করেছিল, তা একদিনে হয়নি। ইপিআই কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক, মোবাইল হেলথ টিম—সব মিলে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে গিয়েছিল। সেই অর্জন রক্ষা করা ছিল নতুন সরকারের প্রথম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা মানে শিশুর জীবন নিয়ে খেলা।

রাষ্ট্র শিশুর অভিভাবক। সংবিধানেও রাষ্ট্রকে শিশুর জীবন, স্বাস্থ্য ও বিকাশ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। যখন রাষ্ট্র নিজেই সেই দায়িত্ব থেকে সরে যায়, তখন সমাজে নেমে আসে ভয়ের অন্ধকার। মব ভায়োলেন্স, লুটপাট, প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে কখনো একটি জাতি এগোতে পারে না।

পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—তোমরা কোথায় ছিলে, যখন আমরা মরছিলাম?
রাষ্ট্রের করনীয় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। দ্রুত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে, টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে হবে, মব ভায়োলেন্স বন্ধ করতে হবে, দোষীদের বিচার করতে হবে, এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে।

আমরা যদি আজও চুপ থাকি, তবে আগামীকাল আরও শিশুর কান্না শুনতে হবে। রাষ্ট্রের প্রথম ধর্ম মানুষ বাঁচানো। সেই ধর্ম ভুললে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সরদার সেলিম রেজা
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র

এই শাখার আরও খবর

৭ গোলের জয়েও আক্ষেপ বাংলাদেশের কোচের

এশিয়া কাপ অনূর্ধ্ব-২০ হকিতে চাইনিজ তাইপেকে ৭-০ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশ। বড় ব্যবধানে জয় পেলেও দলের পারফরম্যান্সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি বাংলাদেশের কোচ মহসিন। বিশেষ করে…

ভিজিট ভিসা নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা

বি১/বি২ ভিজিটর ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রম করা যাবে না বলে সতর্ক করেছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক…

ইন্দোনেশিয়ায় অবৈধ প্রবেশের সময় ৮ বাংলাদেশিসহ আটক ১৬

মালয়েশিয়া থেকে অবৈধ পথে ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশের সময় আট বাংলাদেশিসহ ১৬ জন অভিবাসী শ্রমিককে আটক করেছে দেশটির নৌবাহিনী। সোমবার রিয়াউ প্রদেশের দুমাই শহরের উপকূলীয় এলাকায় অভিযান…

মিটার-সংযোগ ছাড়াই গ্রাহকের নামে এলো ৬৯২ টাকার বিদ্যুৎ বিল

জামালপুরের মাদারগঞ্জে বিদ্যুতের নতুন মিটার স্থাপন কিংবা সংযোগ দেওয়ার আগেই এক গ্রাহকের নামে ৬৯২ টাকার বিল তৈরি হয়েছে। আগস্ট মাসের ওই বিল দেখে বিস্মিত হয়েছেন…

নেপালের সেই সুড়ঙ্গে আর কেউ বেঁচে নেই:কাদায় চাপা পড়েছে সব, ভেঙেছে ছাদও

নেপালের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের যে সুড়ঙ্গ থেকে শুক্রবার দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে আর কেউ বেঁচে নেই বলে নিশ্চিত হয়েছেন উদ্ধারকারীরা। সুড়ঙ্গের শেষ…

আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ ঘর থেকে নবজাতকসহ ৩ লাশ উদ্ধার

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি তালাবদ্ধ ভাড়া বাসা থেকে নবজাতকসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দিবাগত রাতে মধ্য জামগড়া এলাকার হাজী হযরত আলীর চারতলা বাড়ির…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au