নতুন বাজেটের পর অস্ট্রেলিয়ার আবাসন খাতে বড় ধসের আশঙ্কা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ মে- অস্ট্রেলিয়ার আবাসন খাতে আগামী কয়েক বছরে বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন একাধিক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক। বিশেষ করে ফেডারেল বাজেটে নেতিবাচক গিয়ারিং ও মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স) ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের নতুন নীতি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্পত্তি কেনার অর্থনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাড়ির দামে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বাড়ির দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
মরগান স্ট্যানলির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিস রিড বলেন, বাজেটে ঘোষিত কর পরিবর্তন পরিবারগুলোর সম্পদ বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ঋণ নিয়ে সম্পত্তি কেনা এবং ভবিষ্যতে বড় মূলধনী মুনাফার প্রত্যাশার যে মডেল প্রচলিত ছিল, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ব্যাংকটির বিশ্লেষণে বলা হয়, আবাসন চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। কিন্তু লাভ কমে গেলে তারা বাজার থেকে সরে যেতে পারেন, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। মরগান স্ট্যানলি মনে করছে, বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক সমীকরণ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে বাড়ির দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে হতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই জাতীয়ভাবে মূল্য সংশোধন হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকটি সতর্ক করেছে, দুর্বল আবাসন বাজার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। ব্যাংকিং খাত, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা ব্যয় এবং রিয়েল এস্টেট-সংক্রান্ত ডিজিটাল ব্যবসাগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হংকং সাংঘাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন (এইচএসবিসি)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পল ব্লক্সহামও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন। তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাড়ির দাম স্থির থাকতে পারে এবং পরের বছরে ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
তার মতে, চলতি বছর ইতোমধ্যেই বাজারের গতি কমে গেছে। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এই ধীরগতি আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব আগামী বছরেও অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, উচ্চ সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে আবাসন বাজারে চাপ আরও বাড়বে।
বর্তমানে রিজার্ভ ব্যাংক অস্ট্রেলিয়া ধারাবাহিকভাবে সুদের হার বৃদ্ধি করছে। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও মে মাসে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদের হার বাড়িয়ে নীতি সুদের হার ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। বাজারে আরও এক দফা সুদ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার বেশি থাকায় ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা বাড়ির চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। সিডনি ও মেলবোর্নে ইতোমধ্যে কয়েক মাস ধরে দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে পার্থ ও ব্রিসবেনের মতো শহরে বিনিয়োগকারীদের কারণে কিছুটা স্থিতি ছিল, যা এখন পরিবর্তন হতে পারে।
মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাজেটের নতুন নিয়ম অনুযায়ী পুরোনো সম্পত্তিতে কর সুবিধা কমানো এবং নতুন বিনিয়োগে কঠোর শর্ত আরোপের কারণে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে সরে যেতে পারেন।
অন্যদিকে এএমপি-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ শেন অলিভার মনে করেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই জাতীয়ভাবে বাড়ির দাম কমতে শুরু করতে পারে। তার মতে, বাজারে এখনই প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমে এসেছে এবং কর পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও কমবে।
তিনি বলেন, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ফলে সামগ্রিকভাবে আবাসন বাজারে পতনের ঝুঁকি বাড়ছে।
তবে কিছু ব্যাংকের পূর্বাভাস তুলনামূলকভাবে কম নেতিবাচক। কমনওয়েলথ ব্যাংক ২০২৬ সালে বাড়ির দাম প্রায় ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ৩ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। এএনজেড ব্যাংকও কিছুটা প্রবৃদ্ধির আশা করছে, তবে আগের তুলনায় কম।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে আবাসন বাজারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
সিডনিতে ইতোমধ্যে নিলাম বাজারে বিক্রির হার কমে ৪৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা কোভিডকালীন সময়ের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা। ফেব্রুয়ারি থেকে শহরটির বাড়ির দামও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের সতর্ক বার্তা হলো, অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজার এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নীতি পরিবর্তন, সুদের হার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বাজারকে বড় ধরনের চাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্রঃ news.com.au