ইসরায়েলি রোগীদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগে দুই নার্সের বিচার ঘিরে নতুন বিতর্ক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ব্যাংকসটাউন হাসপাতালের দুই নার্স সারা আবু লেবদেহ ও আহমদ রাশাদ নাদিরের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রোগীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বহুল আলোচিত মামলার বিচার শুরুর আগে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুনানিতে মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ভাইরাল ভিডিও, যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই আইনি লড়াই চলছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ভিডিওটিতে পশ্চিম সিডনির ব্যাংকসটাউন হাসপাতালের দুই নার্সকে ইসরায়েলি রোগীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন ইসরায়েলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ম্যাক্স ভেইফার।
বৃহস্পতিবার ডাউনিং সেন্টার জেলা আদালতে অনুষ্ঠিত শুনানিতে দুই অভিযুক্তই উপস্থিত ছিলেন। আগামী আগস্টের শেষ দিকে তাদের মূল বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
আদালতে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা দাবি করেন, ভিডিওটি একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার অংশ ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মতি ছাড়া এটি ধারণ করা হয়েছে। তাই অস্ট্রেলিয়ার আইন অনুযায়ী ভিডিওটি আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
আহমদ রাশাদ নাদিরের আইনজীবী জেমারাই খাতিজ সাংবাদিকদের বলেন, যদি আদালত ভিডিওটিকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে, তাহলে তা প্রসিকিউশনের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হবে।
তিনি বলেন, “আমরা যুক্তি দিয়েছি যে এটি একটি ব্যক্তিগত কথোপকথন ছিল, যা বেআইনিভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। বিচারক বিস্তারিত যুক্তিতর্ক শুনেছেন এবং বিষয়টি বিবেচনা করবেন।”
প্রতিরক্ষা পক্ষের আইনজীবীরা আরও দাবি করেন, ভিডিওটি কোনো জনস্বার্থে ধারণ করা হয়নি; বরং এটি ছিল ‘অ্যাক্টিভিজম’ ও ‘কনটেন্ট তৈরির’ উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি কর্মকাণ্ড।
নার্সদের পক্ষে আইনজীবী গ্রেগ জেমস আদালতে বলেন, “এটি মূলত স্বঘোষিত বিচারকসুলভ আচরণ। তিনি একজন কর্মী বা অ্যাক্টিভিস্ট। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের কাছ থেকে মতামত বের করে আনতে চেয়েছেন এবং পরে সেগুলো ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি শুধু রেকর্ডই করেননি, বরং নিজের অনুসারীদের ওই ব্যক্তিদের পরিচয় খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করেছেন, যাতে তাদের বিরুদ্ধে এই উপাদান ব্যবহার করা যায়।”
আইনজীবীদের মতে, ভিডিওটি নিজের নিরাপত্তার জন্য ধারণ করা হয়েছিল বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি তখন ইসরায়েলে অবস্থান করছিলেন, আর নার্সরা ছিলেন সিডনিতে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দিয়েছে, ভিডিওটি ইসরায়েলে ধারণ করা হয়েছে এবং সেখানকার আইন অনুযায়ী এটি বৈধ। তবে প্রতিরক্ষা পক্ষের দাবি, রেকর্ডিংয়ের মূল উৎস ছিল সিডনিতে থাকা নার্সদের কণ্ঠস্বর। ফলে ঘটনাটি নিউ সাউথ ওয়েলসের আইনের আওতায় বিবেচিত হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রপক্ষ এই যুক্তিকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করে আদালতে মন্তব্য করে যে, এই ব্যাখ্যা অনেকটা এমন যে, “একটি কনসার্টে ব্যবহৃত মাইক্রোফোনের মাধ্যমে শব্দ এসেছে বলে দাবি করা।”
বিচারক মাইকেল ম্যাকহিউও মন্তব্য করেন, যুক্তিটি কিছুটা অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের নজরদারি যন্ত্র আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড করা বেআইনি। এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মামলায় সারা আবু লেবদেহ নিজের বিরুদ্ধে আনা ‘হুমকি, হয়রানি বা অপমানমূলক উদ্দেশ্যে যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার’ এবং ‘একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি’ সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে আহমদ রাশাদ নাদিরও ‘হুমকি, হয়রানি বা অপমানমূলক উদ্দেশ্যে যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার’-সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমানে দুজনই জামিনে মুক্ত রয়েছেন।
ভিডিওটি প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পাশাপাশি জাতীয় প্রতিবন্ধী বীমা কর্মসূচির আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রেও তাদের ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার বিচার প্রায় পাঁচ দিন ধরে চলবে। ভিডিওটি আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে বিচারক মাইকেল ম্যাকহিউ সিদ্ধান্ত সংরক্ষণ করেছেন। আগামী ২৩ জুন এ বিষয়ে তার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে।
সূত্রঃ News.com.au