লেবার পার্টিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে পৌঁছাল ওয়ান নেশন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ জুন- অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রাথমিক ভোটের হিসাবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টিকে ছাড়িয়ে গেছে ডানপন্থি দল ওয়ান নেশন। এই ফলাফলকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ স্বীকার করেছেন যে অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আবাসন সমস্যা জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে, যা বড় দুই দলের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ যে হতাশা ও ক্ষোভের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার মূল কারণ অর্থনৈতিক চাপ। তিনি বলেন, অনেক মানুষ মনে করছেন যে অর্থনীতি তাদের জন্য কাজ করছে না, বরং তারাই অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করছেন। কঠোর পরিশ্রম করেও তারা জীবনমান উন্নত করতে পারছেন না, সঞ্চয় করতে পারছেন না এবং নিজের জন্য একটি বাড়ি কেনার স্বপ্নও পূরণ করতে পারছেন না।
আলবানিজ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজেট নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে খুব কম মানুষই বর্তমান আবাসন ব্যবস্থাকে কার্যকর বলে দাবি করেছেন। তার মতে, যদি সবাই স্বীকার করেন যে বর্তমান ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, তাহলে সেটি পরিবর্তনের দায়িত্বও সরকারকে নিতে হবে। তিনি বলেন, সরকার রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও কিছু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার লক্ষ্য প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধান করা না গেলে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান আরও বাড়বে। ডান কিংবা বামপন্থি যেকোনো ধরনের জনতুষ্টিবাদ তখন আরও শক্তিশালী হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রবণতা শুধু অস্ট্রেলিয়ায় নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দেখা যাচ্ছে।
এদিকে দ্য অস্ট্রেলিয়ানের জন্য পরিচালিত সর্বশেষ নিউস্পল জরিপে দেখা গেছে, ওয়ান নেশনের প্রাথমিক ভোটের হার বেড়ে ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপরীতে লেবার পার্টির সমর্থন নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে। বিরোধী জোটের সমর্থন রয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশে। নিউস্পলের ইতিহাসে এই প্রথম ওয়ান নেশন লেবার পার্টিকে প্রাথমিক ভোটের হিসাবে অতিক্রম করল।
যদিও দুই-দলভিত্তিক পছন্দের ভোটের হিসাব অনুযায়ী লেবার পার্টি এখনো এগিয়ে রয়েছে, তবুও জরিপের এই ফলাফল দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, এটি অস্ট্রেলিয়ার ভোটারদের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাথমিক ভোট পেয়েও ৯৪টি আসন জিতে সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনের পর থেকে দলটির জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে কমেছে বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়ান নেশন দলটির সমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের পর থেকে দলটির সমর্থন বেড়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে লেবার পার্টির সমর্থন কমেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বিরোধী জোটের সমর্থন কমেছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ক্ষুদ্র দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনও কমেছে। পরিবেশবাদী গ্রিনস পার্টির ভোটও আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।
ওয়ান নেশনের নেতা পলিন হ্যানসন জরিপের ফলাফলকে দলের দীর্ঘদিনের অবস্থানের প্রতি জনগণের সমর্থন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মানুষ এখন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব খুঁজছে যারা সরাসরি তাদের সমস্যার কথা বলবে এবং সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করবে।

অস্ট্রেলিয়ায় বাজেট-পরবর্তী জরিপে আলবানিজ ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল ওয়ান নেশন। ছবিঃ সংগৃহীত
৭২ বছর বয়সী হ্যানসন জানান, ভবিষ্যতে তিনি সিনেটে থাকবেন নাকি প্রতিনিধি পরিষদের কোনো আসনে নির্বাচন করবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ভবিষ্যতে সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়েই তার দল এগোবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে অতীতে অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রধানমন্ত্রী সিনেট থেকেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আবাসন ও অভিবাসন নীতি নিয়ে ওয়ান নেশনের অবস্থান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলটি প্রস্তাব করেছে যে বিদেশে বসবাসরত বিদেশি নাগরিক এবং অস্থায়ী ভিসাধারীরা অস্ট্রেলিয়ায় যে সম্পত্তির মালিক, সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের কাছে বিক্রি করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী বাসিন্দা এবং অস্ট্রেলীয় নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ায় সম্পত্তি কেনার সুযোগ বন্ধ করার প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
এই নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে হ্যানসন বলেন, তার দলের কাছে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের জন্য বাড়ি কেনার সুযোগ নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
অভিবাসন ইস্যুতেও ক্ষমতাসীন সরকার চাপের মুখে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ জানিয়েছেন, সরকার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নিট বিদেশি অভিবাসনের সংখ্যা কমিয়ে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। তার মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর সীমান্ত খুলে দেওয়ার ফলে অভিবাসনের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এখন পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
এদিকে বিরোধী লিবারেল পার্টিও কঠিন সময় পার করছে। দলটির নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এলেও জনসমর্থন বাড়ার পরিবর্তে আরও কমেছে। নতুন নেতা অ্যাঙ্গাস টেলরের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও দলীয় সমর্থন নিম্নমুখী রয়েছে বলে জরিপে দেখা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবাসন সংকট, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখন ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বড় দুই দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থায় ভাটা পড়ায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী জাতীয় নির্বাচন এখনো প্রায় দুই বছর দূরে থাকলেও বর্তমান জনমত জরিপ অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। যদি অর্থনৈতিক চাপ এবং আবাসন সংকটের কার্যকর সমাধান না আসে, তাহলে ওয়ান নেশনের মতো দলগুলো আরও বেশি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
সূত্রঃ News.com.au