ভারতে আলোড়ন তুলেছে জেন-জিদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ জুন- ভারতের আলোচিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কি ডিপস্টেট বা চীনের কোন মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ? জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক যখন এই ককরোচ পার্টির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে তখন অনেকেই একটু ভয় পেয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের যত মানবাধিকার সংঘঠনের প্রধান, জলবায়ু কর্মী, দলিত শ্রেণী নিয়ে কাজ করা কোন মানবাধিকার আন্দোলনকারী- সাধারণত এরা হয়ে থাকে ডিপস্টেট বা চীনের এজেন্ট। গোটা বিশ্বেই তাই। বড় বড় পুরুস্কার যখন ছোট ছোট গরীব দেশের কেউ পায় তখন সেটা এজেন্টদের তৈরি করার জন্য দেয়া হয়। সোনম ওয়াংচুক ভারতের যে রাজ্যের মানুষ সেটা চীন সীমান্তের কাছে। তাদের মুখের নৃতাত্ত্বিক মঙ্গলীয় ছাপের জন্য ভারতের অনেকের কাছ থেকে তাদেরকে ‘চাইনিজ’ শুনতে হয় যা তাদের জন্য কষ্টের। এটা তাদেরকে এক ধরণের বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। এক ধরণের জাতীয় পরিচয় সংকটের অভিমান তাদের আছে। সেই তাদের থেকে বের হওয়া সোনম ওয়াংচুক (যাকে নিয়ে থ্রি ইডিয়েটস সিনেমা তৈরি হয়েছে), এর আগেও ভারতের ‘ইনুস’ হবার কিছু সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল তার মধ্যে। ককরোচ পার্টির আইডিয়া যার মাথা থেকে বের হয়েছে সেই অভিজিত দিপকে আবার দলিত সম্প্রদায় থেকে আসা তরুণ। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের জার্সি পরে তার জনসভায় আসার ধরণ দেখে আমার হাসনাত-সার্জিসদের জাতীয় পতাকা কপালে বেধে পরে জাতীয় পতাকাই বদলে ফেলার রাজনীতি শুরুর কথা মনে পড়ে গেছে। কোটা বিরোধী আন্দোলন একটি অভ্যন্তরীন ছাত্র আন্দোলন সেখানে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুক্তিযুদ্ধের গান টেনে আনা হয়েছিল এটা বুঝাতে যে এটা কোন দেশ বিরোধী আন্দোলন নয়! কেউ কি সেটা বলেছিল? না বলেনি। ঐ যে, চোরের মন পুলিশ পুলিশ! ঠাকুর ঘরে কে রে- আমি কলা খাইনি!
অভিজিত দিপকেও জাতীয় পতাকা নিয়ে এসেছে। বলছে সে সংবিধানের পক্ষে। কে তাকে বলেছে সে সংবিধানের বিরুদ্ধে? ভারতে সংবিধানের বিরুদ্ধে মাওবাদীরা আছে। গুপ্ত মুসলিম লীগাররা আছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জাতীয় পতাকা ও সংবিধানকে টেনে আনা কেন? বাংলাদেশের ২৪ এর আন্দোলনে জাতীয় পতাকাকে টেনে আনা হয়েছিল। এটা শুরু হয়েছিল এক দশক থেকে যে কোন আন্দোলনে বাংলাদেশের পতাকাটা থাকতো। চমত্কার ছবি তোলা হতো। কাঁদানো গ্যাসের আঁধারে একজন ছাত্র একা বাংলাদেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন বাংলাদেশ বিদেশী কোন শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে! অথচ ৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয় পতাকা আনতে হয়নি। আনার কোন কারণই নেই। এটা আমাদের অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু ভিপি নূরদের থেকে জাতীয় পতাকা বেধে আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল। সেটি ছিল একটি উদ্দেশ্যমূলক। ভারতের ককরোচ পার্টির ডিজিটাল আন্দোলনও কোন নিরহ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যহীন নয়।
এদিকে ককরোচ পার্টি বাংলাদেশের ছাপড়ি সাংবাদিকতা ও বাম রাজনীতি ও তাদের ভগ্নিপতি ইসলামী রাজনীতির এক্টিভিস্টরা আশা করে বসে আছে যে, ককরোচ পার্টি ভারতকে বাংলাদেশ ও নেপালের মত ধ্বংস করে ফেলতে পারবে। সেই আশাতেই তারা বসে আছে! আসলেই কি এরকম কিছু হবার কোন সম্ভাবনা আছে?
বড় দাগে সেই সম্ভাবনা নেই কারণ এখানে সফল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কিন্তু, ভারতের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক শাসন কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়া সম্ভব যা সুদূরপ্রসারী খারাপ প্রভাব পড়তে পারে। নকশাল আন্দোলন পুরো ভারতজুড়ে আচড় কাটতে না পারলেও ভারত- নেপাল শ্রীলংকা বাংলাদেশের মত আকার হলে শাসনতন্ত্র ভেঙে পড়তো। গোটা পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে সেটা বুঝা যায়। নকশালদের হীরো বানিয়ে যে পরিমাণ গল্প উপন্যাস নাটক তৈরি হয়েছে তাতে পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় তাদের ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটি যে আসল দুর্বলতা সেটি প্রকাশিত হয়েছে। ফলে এরকম রাজ্যগুলোতে ডিপস্টেট ও চীনের খেলায় পাশার ঘুটি কেউ স্বেচ্ছায় হবে, কেউ নিজের অজান্তেই খেলার অংশ হয়ে উঠবে।

ভারতে প্রথমবার প্রকাশ্যে সমাবেশ করল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ছবিঃ সংগৃহীত
ভারতে এখন কারা ক্ষমতায় সেটি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। নকশালদের সময় ভারতে ক্ষমতায় ছিল ইন্দিরা গান্ধির কংগ্রেস। ভারতের যুক্তরাজ্য ব্যবস্থা ও বৃহত গণতান্ত্রিক শাসন অবসান ঘটাতে না পারলেও যুক্তরাজ্য ব্যবস্থায় অনৈক্য তৈরি করাই এখন ডিপস্টেটের লক্ষ্য। অথবা চীনের। উপমহাদেশে আধুনিক অদৃশ্য এক উপনিবেশ স্থাপনে বড় বাধা ভারত। পাকিস্তান ডিপস্টেটের একটি উপনিবেশ জন্ম থেকে। মূলত পাকিস্তানের জন্মই দিয়েছে তখনকার বিশ্বশক্তি। বাংলাদেশ ও নেপাল তাদের উপনিবেশে প্রবেশ করেছে। ভারতকে আগামীতে তাই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। আধুনিক যুগে এখন আর কেউ এসে কারোর দেশ দখল করে নেয় না। কেবল তাদের ‘জাইগিরদার’ এনে বসায়। ইনুস ছিল তেমনই একজন ডিপস্টেটের জাইগিরদার। তার মিশন সফল। এখন তাকে জাতিসংঘের মহাসচিব বানাতে পারে ভেট হিসেবে। কাজটা কঠিন। চেষ্টা চলছে হয়ত।
পৃথিবীতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো তৈরিই হয়েছে আধুনিক উপনিবেশ স্থাপনের সহায়ক দোকান হিসেবে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের গণহত্যার কথা তো জাতিসংঘ জানতো। তাদের মানবাধিকার সংস্থা কি পাকিস্তানকে এ জন্য অবরোধ দিয়েছিল? দেয়নি। অথচ বাংলাদেশে ১৪০০ মানুষকে শেখ হাসিনা সরকার হত্যা করেছে ফট করে বলে দিলো কোন রকম স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়াই। তারা যে রেজিম পরিবর্তনে অংশ নিয়েছিল এখন তো দিনের আলোর মত পরিস্কার। আমরা ধারণা ভারতে ককরোচ পার্টির অনুসারীদের সরকার গুলি করুক তেমন পরিস্থিতি বানাতে এরা সবাই বসে আছে!
তৃতীয় বিশ্বে, আমেরিকা মহাদেশে, আফ্রিকায় সমাজ মাধ্যমে জনপ্রিয় কোন মানবিক মানুষ, প্রতিবাদী কন্ঠস্বরকে বেছে নেয়া হয়। তারপর তাকে ভাইরাল করা হয় দেশের সীমানা পেরিয়ে মহাদেশ পর্যন্ত। অভিজিত দিপকের ককরোচ পার্টির ফলোয়ার ২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সে দাবী করেছে সে খেয়ালের বসে একটা ফান স্যাটায়ার পার্টি যা কেবল মাত্র ভিজুয়াল মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের প্যারোডি হিসেবে থাকবে- তেমন ভাবনা থেকে পোস্ট দিয়েছিল। সেই জিনিস রাতারাতি ভাইরাল এমনি এমনি হয় না। আপনার কোন আইডিয়াকে একদিনের মধ্যে সারাদেশে টক অব দি কান্ট্রি করা সম্ভব এমন কিছু সামাজ মাধ্যমের বড় প্লাটফর্ম আছে। এরা সকলে মিলে আপনাকে শেয়ার দিবে আর কথা বলবে। আর এই ‘সবাই’-কে আগে কেনা হবে। বাংলাদেশে ২৪ এর আগে কি ঘটেছিল? জনপ্রিয় টেন মিনিটস স্কুল, ইংরেজি শেখার কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, পশু প্রেমি, ফ্রি স্কুল, ছিন্নমূলদের ফ্রি খাওয়া-দাওয়া করায় এমন সংগঠনগুলো সবাই সমাজ মাধ্যমে তথাকথিত কোটা আন্দোলনের পক্ষে পোস্ট দেয়া শুরু করেছিল। ভারতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ককরোচ পার্টির যাত্রা!
আধুনিক রাষ্ট্রগুলো আসলে এখন আর আধুনিক নেই। তারা এখনো জনগণকে আগের ফর্মূলায় চালাতে গিয়ে এখন আর পথ পাচ্ছে না। এই যে চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভাই চাকরির জন্য স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট উঠিয়ে দিন না! চাকরির পরীক্ষা আবার কি জিনিস? সে কাজ করতে পারে কিনা তার স্কিল দেখুন আর এরই ভিত্তিতে তাকে চাকরি দিন। পৃথিবীতে চাকরির পরিমাণ ফুরিয়ে আসছে। বহু পেশা হারিয়ে যাচ্ছে আর আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর ৭০-৮০ ভাগ পেশা হারিয়ে যাবে। রাষ্ট্রগুলো- তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা সেসব নিয়ে না ভাবলে ফাস্ট ওয়াল্ড বলতে আমরা যাদেরকে বুঝে থাকি যারা একশো বছরের ভাবনা আগেই ভেবে থাকে- তারা তৃতীয় বিশ্বের অধিক জনসংখ্যা ও সনাতনী চাকরির অভাবকে টার্গেট করে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগাবে। তাই এখন থেকে আপনাদের জনগণের জন্য লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। এখন যাদের বয়স ১০-১২ এদের পেশা বা জীবিকা কি হবে তার হিসেব কষতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবার আগে চাকরির জন্য রিকুটমেন্ট হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকার সচিব হবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দরকার নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যেন সক্রেটিস বের হয় তেমন বিদ্যার জন্য জীবন উত্সর্গকারীদের স্থান হবে। যারা রাষ্ট্রের কাছে চাকরি চাইবে না। বরং রাষ্ট্র তাদের থেকে জ্ঞান নিবে। আগামী কয়েকটা দশক এই অঞ্চলের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং। গরীর মানুষ, সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সমাজের শিক্ষিত বেকার, অশিক্ষত বেকার, সরকারী চাকরি যাদের জীবনের ধ্যান ও জ্ঞান- এইসব কিছু যে রাষ্ট্রগুলোতে ব্যাপক আকার ধারণ করবে সেখানেই এই ক্ষোভগুলোকে কাজে লাগিয়ে একেকটা ‘ইনুস’ এসে বসে পড়বে। ভারত দেশ হিসেবে এককেবারেই আলাদা কাঠামোর। এখনি সেখানে বাইরে থেকে এসে সফল হতে পারবে না। কিন্তু নিশ্চিন্তে নাকে তেল দিয়ে ঘুমালে কিন্তু সর্বনাশ। উপমহাদেশে ভারতকে টিকে থাকবে হবে আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্যই। কেন সেটা আরেকদিন আরেকটা লেখায় বলবো।
লেখক- সুষুপ্ত পাঠক