বিশ্ব

ইরান চুক্তির খবরে উদ্বিগ্ন ইসরায়েল, ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে নেতানিয়াহুর

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী

  • 1:23 pm - June 17, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৫০ বার
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৭ জুন- ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তিকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা নেতানিয়াহু এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মিত্র হিসেবে বিবেচিত ট্রাম্পই এখন যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোচ্ছেন। ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যন্ত নানা বিষয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে। একই সঙ্গে এই অবস্থান তাঁকে দেশের ভেতরে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরবে এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে লাভবান করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই হিসাব অনেকটাই উল্টো দিকে যেতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার খবর প্রকাশের পর ইসরায়েলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবুও ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তি স্পষ্ট।

ইসরায়েলের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার সময়সীমা বারবার বাড়ানো হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নে ইসরায়েলের উদ্বেগগুলো দীর্ঘ সময় অনির্ধারিত থেকে যেতে পারে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের পরিবর্তে সমঝোতার পথে এগোতে আগ্রহী হলেও নেতানিয়াহু সরকার মনে করছে, এতে ইরানের ওপর চাপ কমে যেতে পারে। একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, চুক্তির বর্তমান কাঠামো ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।

লেবাননকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মতবিরোধ নতুন নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময় লেবাননে নতুন সামরিক অভিযান না চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন।

এক পর্যায়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে উত্তপ্ত কথোপকথনের খবরও সামনে আসে। ওই সময় নেতানিয়াহু সাময়িকভাবে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করলেও পরে আবার লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। এর জেরে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

সোমবার জেরুজালেমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু স্বীকার করেন যে তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে, আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু বাড়তি রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, তাঁর জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমছে এবং বিরোধীরা নির্বাচনে ভালো ফলের আশা করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইসরায়েলিদের আস্থাও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৪১ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন যে ট্রাম্প ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন। কয়েক মাস আগেও এই হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করার যে কৌশল নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসছিলেন, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ তিনি অতীতে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের মাধ্যমে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ নিশ্চিত করতে সক্ষম। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, আব্রাহাম চুক্তির বাস্তবায়ন এবং ইরান পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের মতো পদক্ষেপগুলো নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ইরানবিরোধী কৌশল নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে ইসরায়েলের যে কঠোর অবস্থান, তা আলোচনার টেবিলে কতটা গুরুত্ব পাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

তবে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তা নীতিতে কোনো ছাড় দেবে না। তিনি জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার বা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে দেশটি এককভাবেও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সব মিলিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে কৌশলগত দূরত্ব তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রযাত্রা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সূত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

বিচ্ছেদের জল্পনায় জল! দীপাবলির পার্টিতে হাতে হাত রেখে হাজির অভিষেক-ঐশ্বর্যা

দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে নানা জল্পনা বলিউডে। কখনও বিচ্ছেদের গুঞ্জন, কখনও পারিবারিক দূরত্বের খবর। তবে সব জল্পনাকে পিছনে ফেলে আবারও একসঙ্গে দেখা গেল…

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধস, এক দিনেই উধাও আড়াই লাখ কোটি ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ের পর দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর জেরে গতকাল বৃহস্পতিবার বড়…

৩২ কেজির ‘কামানের গোলা’ নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাগ্‌যুদ্ধ, বেইজিংয়ের দাবি মদের বোতল

পাপুয়া নিউগিনিতে (পিএনজি) উদ্ধার হওয়া ৩২ কেজি ওজনের একটি সন্দেহজনক বস্তু ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ। চীনের তৈরি বলে ধারণা করা…

শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে বাংলাদেশে ফের ক্ষমতার পালাবদলের আশঙ্কা কতটা?

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে আবারও রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে নর্থইস্ট নিউজের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।…

নেতানিয়াহুর জোটে ভাঙন, রোববার সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন আইজেনকোট

ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য রোববারের মধ্যে একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে বিরোধী নেতা ও সাবেক…

চুয়াডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয়ের দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লিখল ছাত্রীরা, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ

চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের দেয়ালে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হাসিনা’, ‘মুজিব সেনা’ ও ‘ফিরছি আবার ডিসেম্বর’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান লেখাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au