পলিন হ্যানসন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৯ জুন- অস্ট্রেলিয়ায় বহুসংস্কৃতিবাদ নাকি একক সাংস্কৃতিক পরিচয়-এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে। ডানপন্থি রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশনের নেতা পলিন হ্যানসনের সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন, ধর্মীয় সংগঠন এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ১৭ জুন রাজধানী ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া এক ভাষণে পলিন হ্যানসন বহুসংস্কৃতিবাদকে ‘ব্যর্থ নীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জন্য একক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবাসভূমি হলেও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অভিন্ন পরিচয়ের অধীনে থাকা প্রয়োজন। তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত বহুসংস্কৃতিবাদ নীতি জাতীয় সংহতি দুর্বল করেছে এবং অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ভাষণে তিনি অভিবাসন কমিয়ে আনার আহ্বান জানান এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএস বিলুপ্ত করা এবং সম্প্রচার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
হ্যানসনের বক্তব্যের পরপরই দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ বলেন, দেশের শক্তি তার বৈচিত্র্য, সহনশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির মধ্যে নিহিত। বিভাজনের রাজনীতি কখনো মানুষের প্রকৃত সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতাই অস্ট্রেলিয়ার অগ্রগতির মূল ভিত্তি।
বিরোধী দলও হ্যানসনের প্রস্তাবগুলোর বাস্তবতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অভিবাসন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয় মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল এক বিবৃতিতে হ্যানসনের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি বলেছে, আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য অভিবাসী বা মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই অস্ট্রেলিয়ার সমাজ, অর্থনীতি ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অবদান রেখে আসছে।
তারা আরও সতর্ক করে বলেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার, পারস্পরিক সম্মান এবং বহুসংস্কৃতিবাদ আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার মৌলিক ভিত্তি। এসব মূল্যবোধকে দুর্বল করার চেষ্টা সমাজে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বাড়াতে পারে।
হ্যানসনের ভাষণের সময় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের ভেতরেও প্রতিবাদ দেখা যায়। একদল কর্মী ব্যানার প্রদর্শন করে তার নীতির বিরোধিতা করেন। পরে কর্তৃপক্ষ ব্যানার সরিয়ে দেয় এবং ঘটনাটি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানোর ঘোষণা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পলিন হ্যানসনের এই বক্তব্য শুধু অভিবাসন নীতিকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি করেনি; বরং অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ জাতীয় পরিচয়, সামাজিক কাঠামো এবং বহুসংস্কৃতিবাদের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই এই ইস্যু দেশটির রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।