মেলবোর্ন, ২০ জুন- বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার এবং বিদেশে সম্পদ সঞ্চয়ের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনের পর। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্য প্রকাশের পর অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ স্থানান্তর এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার সমপরিমাণ। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এক বছরের ব্যবধানে আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া মানেই সব অর্থ অবৈধভাবে পাচার হয়েছে, এমন নয়। তবে এ ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্থ পাচার এবং বিদেশে সম্পদ সঞ্চয়ের বিষয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে আমানতের দিক থেকে ভারত প্রথম এবং বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ২০২১ সালের পর ২০২৫ সালেই বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, যে সরকারের আমলেই অর্থ পাচার সংঘটিত হয়ে থাকুক না কেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অর্থ পাচার নিয়ে ইউনূস সরকারের মিথ্যাচার
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতিকে অর্থ পাচার রোধের বাণী শোনান। তিনি নিজের প্রচারের জন্য বিভিন্ন দেশ সফর করে অর্থ পাচার নিয়ে কথা বলেন বটে কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ইউনূস বলেছিলেন, খুব দ্রুত পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হবে। কিন্তু ইউনূসের এ আশ্বাসও ছিল স্রেফ ফাঁকা বুলি।
ইউনূসের চেয়েও এক কাঠি সরেস ছিল তাঁর নিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। যিনি পাচার হওয়া অর্থ ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আনার গল্প শুনিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের টাকায় বিভিন্ন দেশ সফর করেন পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কথা বলে। কিন্তু বেলা শেষে তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
বাস্তবে তাঁর বিরুদ্ধেই অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। গভর্নর থাকাকালেই তিনি দুবাইয়ে তাঁর মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। এটা যে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। কারণ আহসান এইচ মনসুর বা তাঁর মেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কেনার টাকা নিয়ে যাননি।
শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনে ইউনূস সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দু-একজন ছাড়া সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। বিশেষ করে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং আসিফ মাহমুদ কেন সুইজারল্যান্ড সফর করেছিলেন সে প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামসহ ’২৪-এর আন্দোলনে জড়িত অনেকেই ইউনূস সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন।
অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থানও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, স্বচ্ছ তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া অর্থ পাচার রোধ করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করে না, বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতীত ও বর্তমান নির্বিশেষে সব ধরনের অর্থ পাচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন