বাংলাদেশ

ঢাকা: কংক্রিটের দোজখ, মুক্তির রোডম্যাপ

সরদার সেলিম রেজা । রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশ কর্মী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

  • 2:37 pm - June 27, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৪ বার
সরদার সেলিম রেজা। কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র ঢাকা।

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- এক. দীর্ঘশ্বাসের শহর

পঁচিশ বছরের বেশি সময় আমি ঢাকায় বসবাস করেছি। একটা প্রজন্ম। এই শহর আমাকে রুটি দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, মনে হয় আমি একটা দোজখানায় ছিলাম।

এখানে সুউচ্চ বাড়ির পর বাড়ি। আকাশ আর দেখা যায় না, দেখা যায় দেয়াল। গাড়ির পর গাড়ি। রাস্তা যেন চলমান কারাগার। যান্ত্রিক আওয়াজে কান ঝালাপালা। বাতাসে ধুলো, পানিতে বিষ। শ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাসের জন্য মানুষ হাঁপায়।

বৃষ্টি নামলেই শহর ডুবে যায়। কারণ দূরত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ড্রেনেজ সিস্টেম ১৯৬০ সালের খাতায় আটকে আছে। নর্দমা, ভাগার, খাল — সব ময়লার রাজ্য। কলকারখানা, ফ্যাক্টরি, ট্যানারি, ইটভাটা। কেউ কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না। বুড়িগঙ্গা আজ মৃত নদী। তার বুকে দৈনিক ১৫ হাজার টন বর্জ্য আর ৬০ হাজার কিউবিক মিটার ট্যানারির কেমিক্যাল।

হ্যাঁ, গত দেড় যুগে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। মেট্রো এসেছে, ফ্লাইওভার হয়েছে, পদ্মা সেতু হয়েছে। কিন্তু শহরটা ‘চলনযোগ্য’ হয়েছে, ‘বাসযোগ্য’ হয়নি। কারণ আমরা লক্ষণ সারিয়েছি, রোগের গোড়ায় হাত দিইনি।

দুই. সমস্যার সাতটি মুখ

১. মানুষের চাপে ভাঙা শহর:
ঢাকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজার ২শ মানুষ। মুম্বাই, নিউইয়র্কও আমাদের চেয়ে ফাঁকা। [UN]
২০০ সালে ২০ তলার বেশি ভবন ছিল মাত্র ১২টি। আজ তা ১২০০ ছাড়িয়েছে। [RAJUK]
একসময় ঢাকার ৫২ শতাংশ ছিল জলাভূমি। এখন আছে ৪.৫ শতাংশ। [CUS]
মাটি কেটে দালান বানিয়েছি। এখন দালানের ওজন মাটি সইতে পারছে না। শহর প্রতি বছর ১.২ সেন্টিমিটার করে বসে যাচ্ছে।[2022]

২. যানজট: সময়ের লুটপাট:
ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ি সাড়ে ৮ লাখ। কিন্তু রাস্তা মাত্র ৮ শতাংশ। ফলাফল: গড় গতি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার। হাঁটার চেয়েও ধীর। [WB]
একজন ঢাকাবাসী বছরে ৩১৫ ঘণ্টা, মানে ১৩ দিন, শুধু জ্যামে বসে কাটায়। [Tom Index]
জ্বালানি নষ্ট হয় বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকার। শব্দের মাত্রা ৯০ থেকে ১০ ডেসিবল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সীমা ৭০। তাই হাইপারটেনশন, মাথাব্যথা, রাগ — এগুলো এখন ঢাকার জাতীয় রোগ।[2023]

৩. দূষণ: বাতাস, পানি, মাটি — তিন শত্রু:
ঢাকার বাতাসে PM2.5 এর মাত্রা ৭ মাইক্রোগ্রাম। নিরাপদ মাত্রা ৫। মানে আমরা প্রতিদিন ১৫টা সিগারেট খাই, না ধরিয়েই।
বুড়িগঙ্গার পানিতে অক্সিজেন 0.5। মাছ বাঁচতে লাগে 5.0। নদী এখন জৈবিক কবর।
৪৭টি খালের ৩৪টি মৃত। নর্দমা মানেই ময়লার ভাগার। কারণ ৯০ শতাংশ কারখানার ETP নাই, থাকলেও চলে না।[IQAir][DoE][2024]

৪. ভূমিকম্প: নীরব তলোয়ার:
ঢাকা বসে আছে তিনটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের উপর। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বলছে, রিখটার স্কেলে ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ শতাংশ ভবন ধসে পড়বে। [USGS]
২.৩ কোটি মানুষের শহরে ঝুঁকিতে ১.৬ কোটি। রেডক্রিসেন্টের হিসাব বলছে, তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে ৮ থেকে ১০ লাখ। আহত ২০ লাখের বেশি। [BDRCS]
কারণ, রাজউকের নকশা ছাড়া ভবন ৬০ শতাংশ। রাস্তা সরু, উদ্ধারের জায়গা নাই।[2020][2021]

৫. জলাবদ্ধতা ও প্রশাসনের ভাঙন:
এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ৪০ শতাংশ শহর তলিয়ে যায়। কারণ খাল দখল, পাম্প অচল।
সবচেয়ে বড় সমস্যা: সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর — ১২টি সংস্থা, ১২টি দ্বীপ। একজনের দায় আরেকজন নেয় না। তাই ফাইল ঘোরে, সমাধান ঘোরে না।

৬. মানবিক ক্ষয়:
ঢাকার ৩৫ শতাংশ মানুষ ‘Urban Stress’ এ ভোগে। খেলার মাঠ মাত্র ০.১ শতাংশ। বিশ্ব মান ১৫ শতাংশ।
শহর মানুষকে প্রতিবেশী বানায়, পরিবার বানায় না।[2023]

৭. দোজখের অনুভূতি:
এই সব মিলিয়ে আজ ঢাকা আমার কাছে দোজখানা মনে হয়। যেখানে বাড়ি আছে, মানুষ আছে, কিন্তু জীবন নাই।

তিন. সমাধান: দোজখ থেকে মুক্তির সাতটি পথ –

অভিযোগ দিয়ে শহর বাঁচে না। বাঁচে পরিকল্পনা দিয়ে। আমি ৭টি কৌশলগত সমাধানের কথা বলছি।

১. বিকেন্দ্রীকরণ আইন: ৭০% মানুষকে জেলায় ফেরানো
ঢাকা বাঁচাতে হলে ঢাকাকে খালি করতে হবে। লক্ষ্য: ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ২.৩ কোটি থেকে ৭০ লাখে নামানো।
কীভাবে? সরকারি-বেসরকারি চাকরির ৭০ শতাংশ বিভাগীয় শহরে নিতে হবে। কর ছাড়, জমি ছাড় দিতে হবে। প্রতি জেলায় ২৫০ শয্যার সুপার হাসপাতাল, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় করতে হবে।
বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ মানুষ ঢাকায়, কিন্তু উৎপাদন মাত্র ৮ শতাংশ। এই ভারসাম্য না ভাঙলে ভূমিকম্প একদিন সব মিলিয়ে দেবে।[BBS][2023]

২. পদ্মা সেতুকে ‘রিভার্স ম্যাগনেট’ বানানো
পদ্মা সেতু দক্ষিণের ২১ জেলাকে ৩ ঘণ্টায় ঢাকার সাথে জুড়েছে। কিন্তু ভুল করলে এটা হবে জ্যামের নতুন শিরা।
সঠিক কাজ হলো উল্টো: ঢাকার মানুষ, কারখানা, বাজার দক্ষিণে নেওয়া। মাওয়া-ভাঙ্গা-ফরিদপুরে SEZ, আইটি পার্ক। বরিশাল-খুলনায় মেডিকেল সিটি। দক্ষিণে বিনিয়োগে ১০ বছরের করমুক্তি।
তাহলে মানুষ নিজ জেলায় বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করবে। চাকরির ব্যবস্থা হবে ঘরের কাছে। ঢাকার চাপ ৪০ শতাংশ কমে যাবে ১৫ বছরে।

৩. গতিশীলতা বিপ্লব: গাড়ি কম, মানুষ বেশি
রাস্তা বাড়িয়ে জ্যাম কমে না। মানুষ কমালে কমে। লক্ষ্য: গণপরিবহনের অংশীদারিত্ব ২ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ করা।
২০৩৫ সালের মধ্যে ১২টি মেট্রো লাইন, ৮টি BRT, ৫টি ওয়াটার বাস রুট। গুলশান-মতিঝিলে ‘Congestion Charge’ চালু: গাড়ি ঢুকলে ৫০ থেকে ২০০ টাকা। শেষ ১ কিলোমিটারের জন্য ২০ হাজার ই-রিকশা।
তাহলে গতি ৭ থেকে ২৫ কিলোমিটারে উঠবে। বছরে ২ হাজার কোটি টাকা জ্বালানি বাঁচবে।

৪. বুড়িগঙ্গা পুনরুজ্জীবন
ট্যানারি ও কারখানার জন্য ‘Zero Liquid Discharge’ বাধ্যতামূলক। ২০২৮ সালের মধ্যে না মানলে বিদ্যুৎ সংযোগ কাট।
৩৪টি মৃত খাল ২০৩০ সালের মধ্যে খন ও দখলমুক্ত করতে হবে। নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
নদী বাঁচলে বন্যা ৩০ শতাংশ কমবে। মাছ ফিরবে। শহর শ্বাস নেবে।

৫. ভূমিকম্প সহনশীল ঢাকা
২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ‘Retrofitting’ করতে হবে। সরকার ৩০ শতাংশ ভর্তুকি দেবে।
প্রতি ওয়ার্ডে ৫ একর করে খোলা মাঠ রাখতে হবে উদ্ধারের জন্য। বছরে দুইবার মহড়া।
এতে ১০ লাখ মৃত্যুর ঝুঁকি ১ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব।

৬. এক ছাতার শাসন: One Dhaka Authority
১২টি সংস্থার বদলে একটি ‘ঢাকা মেট্রো অথরিটি’। মেয়র নেতৃত্বে। এক বাজেট, এক পরিকল্পনা, এক জবাবদিহি। নইলে নর্দমা কারো না।

৭. সবুজ ও মানসিক ঢাকা
প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য ১০ একর খেলার মাঠ। ৫ তলার বেশি ভবনে ৫০ শতাংশ ছাদবাগান বাধ্যতামূলক। ৭০ ডেসিবলের বেশি হর্ন বাজালে ১০ হাজার টাকা জরিমানা।
শহর মানুষকে শুধু বাঁচাবে না, বাঁচতে শেখাবে।

চার. হিসাবের খাতা: খরচ না করাই সবচেয়ে দামি
না করলে বছরে ক্ষতি করলে ১৫ বছরে খরচ
জ্যাম: ৩৭,০ কোটি টাকা গতিশীলতা: ৮০,০ কোটি
দূষণ চিকিৎসা: ১৪,০ কোটি টাকা নদী ও পরিবেশ: ১৫,০ কোটি
ভূমিকম্প: ৮-১০ লাখ প্রাণ সহনশীলতা: ৪০,০ কোটি
হিসাব পরিষ্কার। খরচ করাই সস্তা। না করাই সবচেয়ে দামি। কারণ তখন দাম দিতে হবে রক্ত দিয়ে।
পাঁচ:-
আমি ঢাকাকে দোষ দিই না। ঢাকা আমাদের দোষে অসুস্থ।
আমরা শহরকে ভেবেছি সোনার হাঁস। তাই ডিমের লোভে পেট কেটে ফেলেছি।

ঢাকা বাঁচবে যদি আমরা তিনটি কথা মানি:
মানুষ কমাও। নদী বাঁচাও। নিয়ম মানাও।

পদ্মা সেতু দরজা খুলে দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের। আমরা কি দক্ষিণের ২১ জেলাকে নতুন ঢাকা বানাবো? নাকি পুরনো ঢাকাকে নতুন কবর বানাবো?

এই শাখার আরও খবর

মক্তবের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মুয়াজ্জিন আটক

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার একটি মক্তবে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মক্তবের শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাটি জানাজানি…

মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য…

রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে ১৬০ জন করে যুদ্ধবন্দি বিনিময়

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই আরও এক দফা যুদ্ধবন্দি বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) উভয় দেশই ১৬০ জন করে যুদ্ধবন্দিকে…

রোমে ছুরিকাঘাতে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নিহত, গুরুতর আহত ছেলে

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নাগরিককে নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ভয়াবহ এ হামলায় পরিবারের ১৮ বছর বয়সী ছেলে গুরুতর আহত…

ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৯২০

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। দেশটির এক শতকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে…

কাঁটাবনে আল বারাকা টাওয়ারে আগুন, ২ জনের মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- রাজধানীর কাঁটাবনের একটি আবাসিক ভবনের দুটি ফ্ল্যাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৭ জুন) দিবাগত রাতে আগুন লাগার এ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au