স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৯ জুন- অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সংঘটিত সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ওই সময় কোথায়, কীভাবে এবং কারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রোববার রাতে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়টি ছিল নানা অস্থিরতায় ভরা। সেই সময় যারা এখন দুর্নীতির হিসাব চাচ্ছেন এবং বিদেশি ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়কালের কার্যক্রম তদন্তের জন্য দুদককে নির্দেশ দেওয়া হোক, যাতে কোথায় কী ধরনের দুর্নীতি হয়েছে এবং কারা দায়ী, তা জাতির সামনে স্পষ্ট হয়।
তিনি দাবি করেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটি প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সর্বোচ্চ দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা ওই সময় দায়িত্বে ছিলেন, তারা কোনোভাবেই দায়মুক্তি পেতে পারেন না।
বাজেট আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে “লুটপাটের অর্থনীতি” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, ব্যাংক খাত, উন্নয়ন প্রকল্প, কর অব্যাহতি এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে ওই সময়ে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। এমন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েই বর্তমান সরকার নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করেছে।
তিনি বলেন, করোনা মহামারি, গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতসহ বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে মাত্র সাড়ে তিন মাসের প্রস্তুতিতে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তার দাবি, অতীতে দেশের অর্থনীতিকে কার্যত তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তুত হওয়া “স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ইকোনমি (২০০৯-২০২৩)” শীর্ষক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব, স্বজনপ্রীতিনির্ভর পুঁজিবাদ এবং লাগামহীন দুর্নীতিই অর্থনীতির সংকটের মূল কারণ হিসেবে সেখানে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও দলীয় প্রভাব ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, গত ১৫ বছরে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প থেকেই ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজনৈতিকভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের অর্থ দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল ও ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হতো বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রস্তাবিত বাজেটকে “নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দিয়ে সেই অর্থ আবার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কোনো নতুন কর আরোপ করা হয়নি এবং অতীতের মতো বাজেট ঘোষণার আগে বা পরে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতাও দেখা যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি জানান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এ খাতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বিদেশি ঋণের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশই ঋণ নিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করে। তবে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়িয়ে ঋণনির্ভরতা কমাতে চায়। এ লক্ষ্যে তিস্তা প্রকল্প ও পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে আগের তুলনায় মামলা গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। আগে অনেক অপরাধই নথিভুক্ত হতো না। এখন অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত মামলা নেওয়া, আসামি গ্রেপ্তার এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের কিছু ক্ষেত্রে মামলা বৃদ্ধির বিষয়টি অপরাধ বৃদ্ধির নয়, বরং অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার হার বৃদ্ধির ফল বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকার এসব অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েও পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি জুয়া, মাদক এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বাজেট ঘোষণার পর বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কোনো ঢেউ দেখা যায়নি। তার মতে, এই বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে এবং সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।