খেলা

বিশ্বকাপের জ্বরে পুড়ি, নিজের মাঠে আগুন লাগাই

সরদার সেলিম রেজা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশ কর্মী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

  • 6:22 pm - June 30, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭১ বার
সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন,৩০ জুন- বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের চেহারা বদলে যায়। গ্রাম থেকে শহর, অলি-গলি, ছাদ থেকে রাস্তা—সবখানে টানানো হয় কয়েক কিলোমিটার লম্বা পতাকা। ব্রাজিলের হলুদ, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা। জার্সি গায়ে পুরো পরিবারের ছবি উঠে যায় ফেসবুকে। মুখে মুখে ফেরে মেসি, নেইমার, এমবাপের নাম। চলে বাজি, পিকনিক, ভূরিভোজ।

এত উন্মাদনা, এত আবেগ—আর কোনো খেলায় দেখা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিজের দেশের পতাকা, নিজের মাঠ, নিজের ফুটবলের প্রতি এই ভালোবাসার এক শতাংশও কি আছে? নেই।

সম্প্রতি খবরে এসেছে, কেউ কেউ শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে প্রিয় দলের নামে কয়েক কিলোমিটার পতাকা টানিয়েছেন। অথচ একই গ্রামের মাঠটি বছরের পর বছর দখল হয়ে পড়ে আছে। কেউ ফেরাতে যায়নি।

নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে দুই-তিনটি খেলার মাঠ ছিল। বিকেল হলেই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা মাঠে জড়ো হতেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে টুর্নামেন্ট হতো। চ্যাম্পিয়ন দল পেত একটি বল আর একটি কাপ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০০০ সালে দেশে খেলার মাঠের সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৭১০টি। ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯১০টিতে। অর্থাৎ ২৪ বছরে অর্ধেকের বেশি মাঠ হারিয়েছি আমরা। অধিকাংশই গেছে বাণিজ্যিক ভবন, মার্কেট ও বাসস্ট্যান্ডের দখলে।

মাঠ হারানোর সঙ্গে হারিয়েছে খেলার সংস্কৃতিও। ২০১০ সালের পর স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেটের কল্যাণে ইউরোপের লিগ ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। মাঠের ছেলে বসে গেছে স্ক্রিনের সামনে। খেলোয়াড়ের বদলে সে হয়ে গেছে দর্শক।

রাষ্ট্রের বাজেটেও খেলাধুলার স্থান কোথায়? ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে খেলাধুলা খাতে বরাদ্দ মাত্র ০.০৭ শতাংশ। সেখানে শিক্ষায় ১.৯ শতাংশ, প্রতিরক্ষায় ৫.৮ শতাংশ। কাঠামো নেই, কোচ নেই, একাডেমি নেই—ফলাফলও নেই।

বর্তমানে ফিফা র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৩। জয় নেই, তাই আবেগও নেই। অথচ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটেই হাসায়, কাঁদায়। মেসি-নেইমার আমাদের নয়, কিন্তু মাঠটা তো আমাদের ছিল। আমরা সেই মাঠটাই হারিয়েছি।

এই মানসিকতার নাম ‘আমরা পারব না’। এই ধারণাটি গত তিন দশকে রাষ্ট্রই গেঁথে দিয়েছে।

সমাধান আছে। সরকার সদিচ্ছা দেখালে আগামী এক যুগের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে পারে।

প্রস্তাবের নাম: ‘মাঠ ফেরাও, ফুটবল ফেরাও’।

প্রথমত, কাঠামো। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব করতে হবে। প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে ক্লাব, সরকারি জমিতে মাঠ। দখলদার উচ্ছেদ করে মাঠ ফেরাতে হবে। প্রতিটি ক্লাবে ইউ-১২, ইউ-১৫, ইউ-১৮ বয়সভিত্তিক দল থাকবে।

দ্বিতীয়ত, বাছাই। ৪৯৫টি উপজেলায় ৪৯৫টি একাডেমি। এখানে ৮০ শতাংশ পাহাড়ি উপজাতি ও ২০ শতাংশ সমতলের বাঙালি খেলোয়াড় নিতে হবে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, সাঁওতালদের শারীরিক সক্ষমতা, স্ট্যামিনা ও ফুসফুসের ক্ষমতা ফুটবলের জন্য উপযোগী। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি থেকে এখনও জাতীয় দলে খেলোয়াড় আসছেন। খেলার মাধ্যমে পাহাড়-সমতলের বিভেদও ঘুচবে।

তৃতীয়ত, শীর্ষ পর্যায়। রাঙামাটিতে গড়ে তুলতে হবে ‘জাতীয় ফুটবল সিটি’। চারটি মাঠ, হোস্টেল, জিম ও ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাব নিয়ে আধুনিক একাডেমি। মডেল হবে আইসল্যান্ড। তিন লাখ মানুষের দেশটি ২০১৮ বিশ্বকাপ খেলেছে, কারণ তাদের আছে ১৭৯টি ইনডোর মাঠ।

১২ বছরের রোডম্যাপ ও বাজেট:
প্রথম তিন বছরে ৫০টি পাড়া ক্লাব ও মাঠ উদ্ধার। পরের তিন বছরে উপজেলা একাডেমি ও বিদেশি কোচ। সাত থেকে নয় বছরের মধ্যে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। আর দশ থেকে বারো বছরের মধ্যে ২০৩৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব।

ব্যয়? বছরে ১০ কোটি টাকা। ১২ বছরে ১২ হাজার কোটি। ২০২৪-২৫ বাজেটের মাত্র ০.১২ শতাংশ। একটি মেগা প্রকল্পের পাঁচ শতাংশ টাকাতেই এটি সম্ভব।

জনসংখ্যা আমাদের পক্ষে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী আছে ১.৪ কোটি। খেলোয়াড়ের অভাব নেই, অভাব কেবল কাঠামোর। ক্রোয়েশিয়া ৪০ লাখ মানুষ নিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে। আমরা পারব না কেন?

সত্যিটা কঠিন। আমরা ৩ কিলোমিটার পতাকা টানাতে পারি, কিন্তু ৩০ গজ মাঠ বাঁচাতে পারি না। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা আমাদের স্বপ্ন দেখায়। বাংলাদেশের মাঠ আমাদের স্বপ্ন নেয়।

সময় এসেছে বদলানোর। মাঠ দখলমুক্ত করতে হবে। পাড়ায় ক্লাব করতে হবে। পাহাড়-সমতল একসাথে ৮০-২০ মডেলে দল করতে হবে। রাষ্ট্রকে বলতে হবে: ‘গদি না, গোলপোস্ট চাই’।

১২ বছর পর যদি বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে, স্টেডিয়ামে ১১ জন বাংলাদেশির গায়ে লাল-সবুজ জার্সি থাকবে। সেদিন আর কেউ জমি বিক্রি করে বিদেশের পতাকা টানাবে না। কারণ নিজের পতাকাই সবচেয়ে বড় হয়ে যাবে।

এই শাখার আরও খবর

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক ঐকমত্য চান নুরুল হক

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- প্রয়োজনে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান…

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ‘কিংমেকার’ ক্রিপ্টো, এআই ও অনলাইন বেটিং

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট অর্থায়নের চিত্র বদলে যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট, ওষুধ, জ্বালানি ও গণমাধ্যমের মতো দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শিল্পের পাশাপাশি এবার ক্রিপ্টোকারেন্সি,…

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের দাবি

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী শিক্ষার্থীকে নিজ মেসে মারধর এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের…

পারস্পরিক আস্থা ও মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ না হলে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা কম: উপদেষ্টা

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরের সম্ভাবনা এখনো ‘ক্ষীণ’। দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পারস্পরিক…

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে কী বদলাবে, কেন উদ্বিগ্ন ভারত?

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ইয়েনি শাফাক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ওই চুক্তিতে যুক্ত করার সম্ভাবনা…

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au