মেলবোর্ন,১ জুলাই- ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগে কঠোর করনীতির প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। গত জুন মাসে দেশটির বাড়ির দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে। এতে গত পাঁচ বছর ধরে টানা ঊর্ধ্বমুখী থাকা আবাসন বাজারের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু আবাসন খাত নয়, অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবাসন বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোটালিটি প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের তুলনায় জুনে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে বাড়ির গড় মূল্য ০ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই দেশটির আবাসন বাজারে সবচেয়ে বড় মাসিক মূল্যপতন।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বড় শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে সিডনি ও মেলবোর্নে। জুন মাসে সিডনিতে বাড়ির দাম কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং মেলবোর্নে কমেছে ১ শতাংশ। অন্যদিকে মাঝারি আকারের শহরগুলোর বাজারেও প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। অ্যাডিলেডে বাড়ির দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি, ব্রিসবেনে বেড়েছে মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পার্থে বেড়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজার সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে সামগ্রিকভাবে বাড়ির মূল্য ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। তবে এই পতনের পরও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাড়ির দাম এখনো ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি রয়েছে।
কোটালিটির গবেষণা পরিচালক টিম ললেস বলেন, সুদের হার বৃদ্ধির আগেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা আবাসন বাজারে চাপ তৈরি করেছিল। এর সঙ্গে সরকারের নতুন সম্পত্তি করনীতি যুক্ত হওয়ায় অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা এখন বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন, যা বাজারকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
এদিকে রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (আরবিএ) জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর ফলে আবাসন বাজার কিছুটা শীতল হওয়া এবং গৃহঋণের চাহিদা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বড় ধরনের মন্দা দেখা দিলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইকুইফ্যাক্স জানিয়েছে, মে মাস পর্যন্ত টানা পাঁচ মাসে দেশটিতে গৃহঋণের আবেদন ৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে আগ্রহীরা। তাদের ঋণসংক্রান্ত অনুসন্ধান এক ধাক্কায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ কমে গেছে।
এ ছাড়া গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী শহরগুলোতে নিলামের মাধ্যমে বাড়ি বিক্রির হার নেমে এসেছে ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশে, যা ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়ের পর সর্বনিম্ন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আবাসন বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন বাজারের এই মন্দা শুধু বাড়ি কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্মাণ শিল্প, রিয়েল এস্টেট, ব্যাংকিং, গৃহঋণ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই সুদের হার, করনীতি এবং আবাসন বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি এখন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।