বাংলাদেশ

ইতিহাসের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া: পর্যটনের সম্ভাবনা

  • 4:36 pm - July 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩০৬ বার
ইতিহাসের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৮ জুলাই- দুই যুগ ধরে পর্যটন নিয়ে লিখছি, কাজ করছি। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ট্রাভেল  এন্ড ট্যুর অপারেশন কোর্স থেকে শুরু করে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে একটা কথা খুব পরিষ্কার বুঝেছি – পর্যটন শুধু সৈকত আর পাহাড় না। পর্যটন হলো ইতিহাস, আবেগ আর মানুষের গল্প।

আর বাংলাদেশে এই তিনটাই এক জায়গায় পাওয়া যায়। সেই জায়গার নাম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া।

১. টুঙ্গিপাড়া কেন “ইতিহাসের বাড়ি”

টুঙ্গিপাড়া কোনো সাধারণ গ্রাম না। এটা জাতির আবেগের কেন্দ্র।

এখানেই জন্মেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এখানেই আছে তার চিরনিদ্রার স্থান – বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স।

প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ আসে। স্কুলের ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা, প্রবাসী, বিদেশি কূটনীতিক। অনেকে আসে শ্রদ্ধা জানাতে। অনেকে আসে ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে।

পদ্মা সেতু হওয়ার পর ঢাকা থেকে টুঙ্গিপাড়া এখন মাত্র ৩ ঘন্টার পথ। আগে যেখানে মানুষ দিনের প্ল্যান করতো, এখন সকাল-সন্ধ্যার ট্যুর সম্ভব। এটাই টুঙ্গিপাড়া পর্যটনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

২. গোপালগঞ্জ: নদী-বিল-গ্রামের অপার সম্ভাবনা

টুঙ্গিপাড়া শুধু একটা সৌধ না। পুরো গোপালগঞ্জই পর্যটনের ক্যানভাস।

ক. মধুমতি নদী ও বিল অঞ্চল

মধুমতি, বাইগার, চন্দ্রা নদী। বর্ষায় থৈ থৈ পানি। শীতে হাজারো পাখি। এখানে নৌ-ভ্রমণ, ফিশিং ট্যুর, সূর্যাস্ত ক্রুজ করা যায়।

খ. গ্রামীণ জনপদ

গোপালগঞ্জের গ্রাম মানে সবুজ ধানের মাঠ, তালগাছের সারি, পুকুরঘাট, মাটির রাস্তা। বিদেশি পর্যটক এই “আসল বাংলাদেশ” দেখতেই আসে।

গ. হস্তশিল্প ও খাবার

গোপালগঞ্জের নকশি কাঁথা, হাতের তৈরি পাটপণ্য, রসের পিঠা, খেজুরের গুড়। প্রতিটি গ্রামকে একটা “প্রোডাক্ট ভিলেজ” বানানো সম্ভব।

৩. গ্রাম পর্যটন + হোম স্টে: বিদেশিদের নতুন আকর্ষণ

বিশ্ব এখন “Mass Tourism” থেকে বের হয়ে “Experience Tourism” এ যাচ্ছে। মানুষ চায় লোকাল মানুষের সাথে থাকতে, খেতে, কাজ করতে।

টুঙ্গিপাড়া মডেলে যা করা যায়:

১. হোম স্টে ভিলেজ

টুঙ্গিপাড়া ও আশপাশের ৫-৬টি গ্রামে ২০টি বাড়িকে “মডেল হোম স্টে” বানানো। মাটির ঘর, টিনের চাল, উঠানে তুলসী তলা।

পর্যটক সকালে গরুর দুধ দোয়াবে, দুপুরে কলাপাতায় ভাত-মাছ খাবে, রাতে লোকগান শুনবে।

কেরালা এই মডেলে বছরে ৩০০০ কোটি টাকা আয় করে। আমরাও পারবো।

২. কৃষি-পর্যটন

পর্যটককে দিয়ে ধান লাগানো, মাছ ধরা, সবজি তোলা। “Farm to Table” কনসেপ্ট। শহরের মানুষ এটার জন্যই পাগল।

৩. ইতিহাস-পর্যটন সার্কিট

টুঙ্গিপাড়া → কাশিয়ানী → গোপালগঞ্জ শহর → মধুমতি। এই রুটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, লোকসংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলা।

৪. ইয়োগা ও ওয়েলনেস ক্যাম্প: নতুন সম্ভাবনা

টুঙ্গিপাড়ার শান্ত পরিবেশ, নদীর পাড়, সবুজ মাঠ – ইয়োগা ক্যাম্পের জন্য আদর্শ।

কীভাবে হবে:

১. “মধুমতি ইয়োগা রিট্রিট”: নদীর পাড়ে বাঁশের কটেজ। সকালে ইয়োগা, ধ্যান, আয়ুর্বেদিক খাবার।

২. ইতিহাস + সুস্থতা: সকালে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা, বিকালে ইয়োগা ও বই পড়া।

৩. শীতকালীন ক্যাম্প: নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি। ঢাকা ও বিদেশ থেকে মানুষ ৩-৫ দিনের প্যাকেজে আসবে।

ভারতের ঋষিকেশ, কেরালায় এই মডেল হিট। গোপালগঞ্জের নিরিবিলি পরিবেশে এটা আরও ভালো হবে। কারণ এখানে আছে ইতিহাসের শক্তি।

৫. করণীয়: ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা

দুই যুগের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, শুধু সম্ভাবনা বললে হবে না। কাজ করতে হবে।

১. “টুঙ্গিপাড়া ট্যুরিজম অথরিটি” গঠন

স্থানীয় প্রশাসন, বিটিসি, ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র মিলে আলাদা বডি।

২. অবকাঠামো উন্নয়ন

সমাধি কমপ্লেক্সের পাশে আন্তর্জাতিক মানের ভিজিটর সেন্টার, ডকুমেন্টারি হল, লাইব্রেরি।

৩. হোম স্টে নীতিমালা

গ্রামের ১০০টি বাড়িকে ট্রেনিং দিয়ে হোম স্টে লাইসেন্স দিতে হবে। বিটিসির সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমরাই ট্রেনিং দিতে পারি।

৪. মধুমতি রিভার ক্রুজ

টুঙ্গিপাড়া থেকে খুলনা পর্যন্ত ছোট লঞ্চ। পথে গ্রাম, বিল, পাখি দেখা।

৫. “টুঙ্গিপাড়া ইয়োগা ও সাংস্কৃতিক উৎসব”

প্রতি বছর ১৭ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর। দেশি-বিদেশি ইয়োগা গুরু + লোকশিল্পী।

৬. ডিজিটাল প্রচার

“Visit Tungipara – The Home of History” ক্যাম্পেইন। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে গ্রাম ও সমাধির ভিডিও।

৬. অর্থনৈতিক প্রভাব

একজন পর্যটক যদি টুঙ্গিপাড়ায় ২ রাত থাকে:

– হোম স্টে: ২,০০০ টাকা

– খাবার ও গাড়ি: ১,৫০০ টাকা

– গাইড ও বিবিধ : ১,০০০ টাকা

মোট: ৪৫০০ টাকা

বছরে ১ লক্ষ পর্যটক আসলে ৪৫ কোটি টাকা সরাসরি গ্রামের মানুষের পকেটে যাবে। সাথে তৈরি হবে গাইড, রাঁধুনি, কারিগরের কাজ।

কক্সবাজার আছে, সুন্দরবন আছে। কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার মতো “আবেগ” আর কোথাও নেই।

বিদেশি যখন বঙ্গবন্ধুর সমাধির সামনে দাঁড়াবে, যখন কোনো গ্রামের দাদির হাতের পিঠা খাবে, যখন মধুমতির পাড়ে ইয়োগা করবে – তখনই সে বাংলাদেশকে বুক দিয়ে অনুভব করবে।

পদ্মা সেতু দরজা খুলে দিয়েছে। এখন দরকার পরিকল্পনা, বিনিয়োগ আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ইতিহাসের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া* শুধু স্মৃতির জায়গা না। এটা হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন রাজধানী। আমি যদি পর্যটন বিষয়ক  মন্ত্রী হতে পারতাম তাহলে সবার আগে ইতিহাসের বাড়ির পর্যটনের রুপ দিতাম। আরেকটি কথা পর্যটন ও বিমান আলাদা  মন্ত্রণালয় করা উচিত। তাতে   পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভালো হবে। এটা অনেক বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।   থাক সেসব কথা সবার পর্যটন নিয়ে নতুন চিন্তার গুরুত্ব দিতে হবে।

আসুন, আমরা গ্রাম বাঁচাই, ইতিহাস বাঁচাই, পর্যটন দিয়ে দেশ বদলাই।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

লেখক-

সরদার সেলিম রেজা

রাজনৈতিক ও পর্যটন বিশ্লেষক 

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র

 

এই শাখার আরও খবর

মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, বন্ধ ইলিশ আহরণ

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও নদ-নদীতে…

তিন কাউন্সিলর নিয়েই ইংরেজবাজার পুরসভা বিজেপির দখলে

মালদহ জেলা পরিষদের পর এবার ইংরেজবাজার পুরসভাও দখলে নিল বিজেপি। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটাভুটিতে বিজেপি প্রার্থী অম্লান ভাদুড়িকে সমর্থন করেন তৃণমূল থেকে ‘নির্দল’ হওয়া ১১…

শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত সরকারের

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরুর আগে…

রামেবির ভিসিকে ‘মব’ সৃষ্টি করে পদত্যাগ: বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হককে একদল মানুষ জোরপূর্বক ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আব্দুস সালাম (৫৬)…

গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: দেড় মাসেও কাটেনি ভয়, এলাকায় নেই পূজার আমেজ

রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাছুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয়…

সেনাবাহিনীতে বড় রদবদল, সংকুচিত হচ্ছে ওয়াকার-উজ-জামানের প্রভাব?

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গত ৮ সেপ্টেম্বর জারি করা একাধিক সীমিত-প্রচলন বা ‘রেস্ট্রিক্টেড’ বদলি ও পদায়নের আদেশ ঘিরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au