অস্ট্রেলিয়া সফরে নতুন পরীক্ষা মোদি-আলবেনিজ সম্পর্কের।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ জুলাই- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফর ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেলেও এর আড়ালে রয়েছে বেশ কিছু জটিল রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। মেলবোর্নে অনুষ্ঠিতব্য এই সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উষ্ণ সম্পর্ককে বাস্তব সাফল্যে রূপ দেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৩ সালে সিডনিতে নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ তাকে বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ব্রুস স্প্রিংস্টিনও এত উষ্ণ অভ্যর্থনা পাননি, যতটা পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। সেই মন্তব্য যেমন দুই নেতার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি মানবাধিকারকর্মী ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিছু নাগরিকের সমালোচনারও জন্ম দিয়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো উপেক্ষা করে তাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও নরেন্দ্র মোদি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
এবারের সফরে মেলবোর্নে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ানদের বিশাল সমাবেশে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে অ্যান্থনি আলবেনিজের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক অভূতপূর্বভাবে শক্তিশালী হয়েছে। কোয়াড জোটের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা, সামরিক মহড়া, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। একই সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় নয়াদিল্লি ও ক্যানবেরার পারস্পরিক সহযোগিতাও আরও জোরদার হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক কমানো এবং বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ হয়েছে। বর্তমানে আরও বিস্তৃত একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কৃষিপণ্য বাজার উন্মুক্তকরণসহ কয়েকটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে অভিবাসন ও শিক্ষার্থী ভিসা নীতিও সফরের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরোপ করেছে, যা ভারতীয় শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের ওপর প্রভাব ফেলছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব বিষয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, তবে দুই নেতার মধ্যে খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এসব ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান সবসময় এক নয়। এছাড়া রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটে দুই দেশের ভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থানও আলোচনায় উঠে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি, শিক্ষা, অভিবাসন এবং প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়কে ঘিরে বহুমাত্রিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তবে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নের ওপর। উষ্ণ অভ্যর্থনা ও জনসমর্থনের বাইরে গিয়ে দুই দেশ যদি বাস্তব সহযোগিতা আরও গভীর করতে পারে, তবেই এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব আগামী দিনে আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।