বাংলাদেশ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন

ভূমিধসে প্রাণহানি, রোহিঙ্গাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ

  • 3:56 am - July 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯৩ বার
ভূমিধসে প্রাণহানি, রোহিঙ্গাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৪ জুলাই- বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সাম্প্রতিক ভূমিধসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু এবং তিন হাজারের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি বলেছে, এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা ও অপর্যাপ্ত সহায়তার ফলে সৃষ্টি হওয়া একটি পূর্বানুমেয় মানবিক বিপর্যয়।

সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী খাড়া, বন উজাড় করা পাহাড়ে বাঁশ ও ত্রিপলের অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকা ভূমিধস, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এদিকে মিয়ানমার থেকে নতুন করে শরণার্থী আসতে থাকায় শিবিরগুলো আরও ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক দাতা দেশগুলোর প্রতি শরণার্থী শিবিরের অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানো এবং বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, চলাচলের পথ ও জরুরি পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়ন দ্রুত পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, প্রতি বর্ষাতেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য পরিস্থিতি আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। পাহাড়ের মাটি ধসে অস্থায়ী ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ছে, অথচ শিবির সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কমে গেছে। তার ভাষায়, এটি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এমন নীতির ফল, যা শরণার্থীদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আবহাওয়াজনিত ২৮৬টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৬ হাজার ১১৯ জন রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ সময় ৯৫টি ভূমিধসে ৪ হাজার ৩০৭ জন বাস্তুচ্যুত হন। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২ হাজার ৮০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় ১৩টি। এছাড়া শিক্ষা কেন্দ্র, টয়লেট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা দেয়াল, সড়ক, সেতু ও সিঁড়িরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নিয়েছে। তবে অনেকেই নিজেদের আশ্রয় ছেড়ে যেতে অনিচ্ছুক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নয়জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা এবং চারজন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মী।

একজন পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকৌশলী বলেন, শুরু থেকেই শিবিরের নকশায় ত্রুটি ছিল। পাহাড় কেটে কোনো পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়াই শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমানে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় টেকসই ভূমিধস প্রতিরোধব্যবস্থা, বিশেষ করে ইটের স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারও স্থায়ী নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ, তাদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আশ্রয় বরাদ্দ না থাকায় অনেকে অনিরাপদ জায়গা ভাড়া বা কিনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আসা এক রোহিঙ্গা বলেন, তিনি বারবার বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কাছে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু নতুন আগতদের জন্য কোনো আশ্রয় বরাদ্দ নেই বলে তাকে জানানো হয়। পরে পাহাড়ের ঢালে নিজে একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেন। গত ৬ জুলাই ভূমিধসে তার দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনির মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, পাহাড় এভাবে ধসে পড়বে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার পর এ বছরের মে মাস পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৫২ হাজার নতুন রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন। অথচ ২০২৫ সালের যৌথ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় নতুন করে মাত্র ৫০ হাজার শরণার্থী আসার হিসাব ধরা হয়েছিল। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যমান পরিকল্পনা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, নতুন শরণার্থীদের জন্য অতিরিক্ত জমি বরাদ্দের বিষয়ে ইউএনএইচসিআরের অনুরোধের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে নতুন আগতদের বিদ্যমান ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাতেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।

মানবিক সহায়তা কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্রের তীব্র সংকট থাকায় অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকি জেনেও ঘর ছাড়তে চান না। জরুরি পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোতেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও প্রয়োজনীয় সেবার ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার বর্তমান বাঁশ ও ত্রিপলের পরিবর্তে তুলনামূলক শক্তিশালী অস্থায়ী আশ্রয় নির্মাণ এবং কয়েক ধরনের আধা-স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছিল। এমনকি ৫০ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেমে যায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাকে স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সংস্থাটি দাতা দেশগুলোর প্রতি নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণে অর্থায়ন এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতি দুর্যোগ-সহনশীল নকশা ও নিরাপদ পুনর্বাসনের সুযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

বর্তমানে আশ্রয় ও শিবির ব্যবস্থাপনা খাতের মানবিক তহবিলের মাত্র ৪২ শতাংশ অর্থ পাওয়া গেছে। এখনও প্রায় ৭ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় আরও ২ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে। রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম বর্ষা মৌসুমজুড়ে প্রাণহানি ঠেকাতে ঢাল স্থিতিশীল করা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন, জলাধার ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জরুরি অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, উদ্বেগ প্রকাশ করলেই হবে না, রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। আরেকটি ভূমিধসে আরও একটি পরিবারকে হারানোর অপেক্ষায় না থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই শাখার আরও খবর

রোনালদোকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন পর্তুগাল কোচ, যা বললেন জর্জ জেসুস

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অবসরের ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পর্তুগাল জাতীয় দলের প্রধান কোচ জর্জ জেসুস। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকাকে জাতীয় দল থেকে অবসর…

কোস্ট গার্ডের পাঁচ জাহাজের নাম পরিবর্তন, বাদ ‘জয় বাংলা’ ও জাতীয় চার নেতার নাম

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি জাহাজ থেকে ‘জয় বাংলা’ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় চার নেতার…

‘সরকারি দপ্তরে টাকা না দিলে শ্রমিকদের ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারতাম’

সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে না হলে পোশাকশ্রমিকদের মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া সম্ভব হতো বলে মন্তব্য…

শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে আদালতে পরীমনি-কাণ্ড, কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত?

ভাস্কর দত্ত দেশে শ্রমিকদের আন্দোলন, বেতন-ভাতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে যখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় অংশের মনোযোগ কেড়ে…

ইরানের বাকি অংশও ধ্বংস করতে হতে পারে, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানের অবশিষ্ট অংশও ধ্বংস করতে হতে পারে। এ বিষয়ে…

বেতন বাড়ানোর আশ্বাসেও থামেনি পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ; বন্ধ শত শত কারখানা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। মাসিক ন্যূনতম মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর দাবিতে বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au