ইরানের বাকি অংশও ধ্বংস করতে হতে পারে, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানের অবশিষ্ট অংশও ধ্বংস করতে হতে পারে। এ বিষয়ে…
ভাস্কর দত্ত
দেশে শ্রমিকদের আন্দোলন, বেতন-ভাতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে যখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় অংশের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে ঘিরে আদালতকাণ্ড।
আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পাওয়ার দিনই সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কিতে চারজন আহত হওয়ার ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
ফলে আদালতের একটি মামলার শুনানি ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে তারকাকে ঘিরে উত্তেজনা। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি নিছক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো হিসাব-নিকাশ?
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান পরীমনি। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। আদালতে হাজির হয়ে জামিন পাওয়ার পর বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে সেই বিরোধ এবং আদালত প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় পরীমনি ও তাঁর নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির অভিযোগও সামনে আসে।
নিরাপত্তাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকজন সাংবাদিকের পাশাপাশি একজন বিচারপ্রার্থীও আহত হন। এরমধ্যে আহত চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন সাংবাদিক এবং একজন আদালত প্রাঙ্গণে আসা বিচারপ্রার্থী।

এক সাংবাদিককে হুমকি দিচ্ছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। ছবি : সংগৃহীত
আদালতে তারকার নিরাপত্তাবলয়
সেদিন পরীমনির সঙ্গে অন্তত ১০ জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন। তাঁদের ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে তৈরি হয় নিরাপত্তাবলয়। ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। একজন বিচারপ্রার্থীর মাথায় আঘাত লাগে। কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হন এবং তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
একজন চিত্রনায়িকার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে এতসংখ্যক ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি কেন প্রয়োজন হলো, তাঁদের পরিচয় ও দায়িত্ব কী ছিল—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আদালত প্রাঙ্গণ কোনো তারকার ব্যক্তিগত আয়োজনের জায়গা নয়। সেখানে সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থীসহ সাধারণ মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আদালত কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের কারণে সেই পরিবেশ বিঘ্নিত হলে তার জবাবদিহি থাকা জরুরি।
সমকালের মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক রবিউল হোসাইন রাজার অভিযোগ, ভিডিও ধারণের সময় পরীমনি তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। তাঁর ট্রাইপডও ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পরে ফোনটি তিনি ফিরিয়ে নেন। আদালত থেকে বের হওয়ার সময় পরীমনি তাঁর কাছে গিয়ে গালিগালাজ করেন বলেও অভিযোগ করেন এই সাংবাদিক। অন্য সাংবাদিকদেরও হেনস্তা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে পরীমনি অভিযোগ করেছেন, ওই সাংবাদিক তাঁর গায়ে হাত দিয়েছেন। ফলে ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বিরোধ রয়েছে।

চিত্রনায়িকা পরীমণি। ছবি : সংগৃহীত
সাংবাদিকের শারীরিক অবস্থা নিয়েও আলোচনা
পরীমনির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা সাংবাদিকের একটি হাতে জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—বিষয়টি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ তথ্যকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের প্রেক্ষাপট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার সময় পুলিশ কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেনি।
আদালতের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাঁদের উপস্থিতিতে কীভাবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করলেন, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে। আদালত প্রাঙ্গণে একজন বিচারপ্রার্থী আহত হওয়ার ঘটনাও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
শ্রমিক আন্দোলনের সময়েই পরীমনি-কাণ্ড
ঘটনার সময়কাল নিয়ে আলোচনা এড়ানোর সুযোগ নেই। দেশে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া, আন্দোলন, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে যখন জনপরিসরে আলোচনা চলছিল, তখন পরীমনিকে ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনা দ্রুত সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় আলোচনায় পরিণত হয়। শ্রমিকদের দাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর পাশাপাশি বিনোদনজগতের একজন তারকাকে ঘিরে সংঘাত কীভাবে এত ব্যাপক মনোযোগ পেল, সেই প্রশ্নও উঠছে।
ঘটনার আগে-পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, তারকার বক্তব্য, সাংবাদিকদের অভিযোগ এবং নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা কি কেবল একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, নাকি এর পেছনে পরিকল্পিত প্রচার বা মনোযোগ ঘোরানোর কোনো কৌশল কাজ করেছে। এমনকি কেউ কেউ গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ
সাংবাদিক সংগঠনগুলো এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে। এখন প্রয়োজন আদালত প্রাঙ্গণের সিসিটিভি ও সংবাদমাধ্যমের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং পরীমনির সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের পরিচয় ও দায়িত্ব খতিয়ে দেখা। একই সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা এবং সাংবাদিকদের অভিযোগেরও তদন্ত হওয়া দরকার।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শ্রমিকদের আন্দোলন ও অর্থনৈতিক সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুর মধ্যে পরীমনি-কাণ্ডের ব্যাপক প্রচার কি নিছক সময়ের কাকতাল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছে? প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au