শেখ হাসিনার দিল্লির সংবাদ সম্মেলন ঘিরে নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ আগষ্ট: ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হলেও শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং তার দেশে ফেরার ইচ্ছা দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের উদ্যোগে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে অবস্থান করছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানান।
শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আগেই ভারতের কাছে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশের দাবি, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এমন ঘটনা সেই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।
তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থনও করে না বলে জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চান। এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে চান। তার বক্তব্যে দেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে অবস্থান জানানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের কয়েকজনও জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর তারা বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, তারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নিজেদের অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরতে চান।
বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়।
বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন।
এসব ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক যোগাযোগ হিসেবে দেখছিলেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থান
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ঢাকা বিভিন্ন সময়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কূটনৈতিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি নয়াদিল্লি।
এর মধ্যেই শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করায় বিষয়টি আবারও দুই দেশের আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবাদ সম্মেলনের আগে ভারতের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। এরপরও অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় ঢাকার পক্ষ থেকে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।
কূটনীতিকদের মধ্যে ভিন্নমত
শেখ হাসিনার নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনের প্রভাব নিয়ে সাবেক কূটনীতিকদের মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের চলমান প্রচেষ্টার জন্য সহায়ক হয়নি। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছিল, এ ধরনের ঘটনা সেই প্রক্রিয়াকে কিছুটা কঠিন করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, এ ঘটনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো প্রয়োজন ছিল না। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক দ্বিপক্ষীয় বিষয় রয়েছে, যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশ আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তবে এখন ভারতের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?
শেখ হাসিনার নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবারও একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে এসেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একদিকে ঢাকা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এসব কারণে সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো সচল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন বিশ্লেষকেরা।
শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা স্পষ্ট করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারও ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা এবং এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা