‘জীবন যখন ফুরিয়ে আসছে, তখনই মনে হয় জীবন কত সুন্দর’
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্টঃ একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ৯ আগস্ট ৮৬ বছরে পা দিয়েছেন। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনে নাটক, অভিনয়, সংগঠন ও সম্পাদনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান…
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট- ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করায় অঞ্চলটির ভঙ্গুর শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় বসবাসরত ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তৈরি ১৫ দফা পরিকল্পনায় হামাসকে অস্ত্র ত্যাগের বিনিময়ে ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় একটি নিরপেক্ষ ও কারিগরি ফিলিস্তিনি কমিটির হাতে গাজার প্রশাসন তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পরিবর্তে ইসরায়েল এখনো গাজার বড় অংশের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর গাজা নিয়ে শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করার পরও সেখানে প্রায় প্রতিদিনই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে রোববার নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছেন, হামাসকে ‘সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র’ না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে না।
ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নেতানিয়াহুর এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর গাজায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েছে। সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি নিয়ে যে সামান্য আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তাও অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। নতুন করে ব্যাপক হামলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
গাজাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এয়াদ আল-কুররা বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবারও হত্যাকাণ্ড, বোমা হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা শুরু করার পথে যেতে পারেন।
তিনি গাজায় ইসরায়েলের একতরফাভাবে নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কথা উল্লেখ করেন। এই রেখাটি কার্যত একটি ইসরায়েলি বাফার জোন হিসেবে কাজ করছে এবং এর কারণে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের এলাকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরও নেতানিয়াহুর অবস্থানকে আলোচনার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ‘পরিষ্কার ও স্পষ্ট অভ্যুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এক বিবৃতিতে দপ্তরটি বলেছে, ইসরায়েলের এই অবস্থান শান্তির পথকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং গাজার মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে।
দপ্তরটির অভিযোগ, ইসরায়েল আলোচনাকে রাজনৈতিক আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে সময়ক্ষেপণ করছে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গাজায় তাদের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজা সিটির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভবনগুলোর পাশ দিয়ে চলাচল করছেন ফিলিস্তিনিরা। ছবি: বাশার তালেব/এএফপি
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তবে হামাস জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘শান্তি বোর্ড’ এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর অধীনে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
এক বিবৃতিতে হামাস মধ্যস্থতাকারী, চুক্তির নিশ্চয়তাদাতা পক্ষ এবং শান্তি বোর্ডকে নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির সব পক্ষকে সমঝোতার শর্ত মেনে চলা এবং যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে কোনো লঙ্ঘন বা বাধা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষক এয়াদ আল-কুররা সতর্ক করে বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যদি ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হন, তাহলে ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর অর্থ হবে নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যানের পর আলোচনাপ্রক্রিয়া কার্যত শেষ হয়ে যাওয়া।
নেতানিয়াহুর অবস্থানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়েও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি সতর্ক করে বলেছেন, গাজার জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার আশঙ্কা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
মিসরের গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, গাজায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হলে, যেখানে মানুষের পক্ষে সেখানে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন সেটিকে কোনোভাবেই ‘স্বেচ্ছায় বাস্তুচ্যুতি’ বলা যায় না।
তিনি বলেন, গাজার মানুষকে এভাবে চলে যেতে বাধ্য করা মিসর, আরব দেশ এবং মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি ‘লাল রেখা’। মিসর কোনোভাবেই ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি মেনে নেবে না এবং তা হতে দেবে না।
একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় সমালোচনা করেন। বিশেষ করে গাজায় প্রতিদিন অন্তত ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার শর্তটি আসলে নিরাপত্তার প্রয়োজনের চেয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করার একটি কৌশল।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ মাহজুব জুয়েরি বলেন, নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য গাজায় স্বাভাবিক ফিলিস্তিনি সমাজব্যবস্থা ফিরে আসতে না দেওয়া।
তাঁর মতে, নেতানিয়াহু এমন একটি গাজা চান না, যেখানে হামাসের শাসন থাকবে, আবার ফিলিস্তিনিদেরও স্বাভাবিক জীবন থাকবে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর পরিবর্তে গাজাকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার চেষ্টা চলছে, যেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
জুয়েরি বলেন, গাজার মতো পরিবেশে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ সেখানে অস্ত্রের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই এবং নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো পক্ষও নেই, যারা অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি যাচাই করতে পারে।
তিনি একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সংঘাত তৈরির আশঙ্কা করেছেন। তাঁর মতে, সামনে বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ এবং নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবন।ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিহাদ আবু গশ মনে করেন, গাজা নিয়ে ইসরায়েলের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রকাশ করছে।
তাঁর দাবি, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিস্তারিত জানতেন। তারা সম্ভবত ধরে নিয়েছিলেন, হামাস পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করবে।
আবু গশ বলেন, মূল বিষয় হলো ইসরায়েল গাজার জনগণকে বাস্তুচ্যুত করার সম্ভাবনা পুরোপুরি ত্যাগ করতে চায় না। তাঁর মতে, পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েলের আপত্তির পেছনেও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু তাঁর বর্তমান অবস্থানকে ভবিষ্যতের যেকোনো ইসরায়েলি সরকারের জন্য একটি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করতে চাইছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে তাঁর ওপর রাজনৈতিক চাপ রয়েছে।
লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০১৯ সাল থেকে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলছে। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর কারাদণ্ডও হতে পারে।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আদেল শেদেদ মনে করেন, নেতানিয়াহু এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, যখন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বড় ধরনের ‘না’ বলতে পারবেন এবং সেটিকে নিজের রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করতে পারবেন।
তাঁর মতে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণের কাছে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান, যিনি প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারেন।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলার স্থান পরিদর্শন করছেন একজন ফিলিস্তিনি। ছবি: রয়টার্স
আরেক বিশ্লেষক সুলেইমান বিশারাত বলেন, নেতানিয়াহু গাজা ইস্যুকে ব্যবহার করে বৃহত্তর আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন।
তাঁর মতে, নেতানিয়াহু গাজা ইস্যুকে কেন্দ্র করে পুরো কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে চাইছেন। কারণ তাঁর কাছে গাজা ইস্যুটিই অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ডানপন্থী জনগোষ্ঠীর কাছে নিজেকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
সব মিলিয়ে, গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে। হামাস নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা এবং ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মতপার্থক্য থেকেই গেছে। নেতানিয়াহু যদি তাঁর বর্তমান অবস্থান থেকে সরে না আসেন এবং মধ্যস্থতাকারীরা ইসরায়েলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে না পারেন, তাহলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে গাজায় আবারও ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au