মুর্শিদাবাদে চার শিশুকে হাঁসুয়া দিয়ে কোপ, নিহত ৩, সংকটাপন্ন ১
মেলবোর্ন, ১৫ আগষ্ট- পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুতিতে চার শিশুর ওপর ধারালো হাঁসুয়া নিয়ে হামলার ঘটনায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় আরও এক শিশু…
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট—বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম ও হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত, ভারী এবং গভীর শোকাবহ এক কৃষ্ণপক্ষ। এদিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে এক পৈশাচিক ও নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। যে মানুষটি নিজের পুরো জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই বাঙালি জাতির অধিকার ও মুক্তির জন্য, ঘাতকদের বুলেটে তাঁর নিথর দেহ চালনি হয়ে পড়েছিল রক্তে ভেজা মাটিতে। এ যেন বিশ্বাস করা যায় না এমন এক বজ্রপাত, যা গোটা জাতিকে বাকরুদ্ধ ও স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকদের পরম নির্দেশ ছিল চরম গোপনীয়তা ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য তাড়াহুড়োয় মরদেহ মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার, যাতে টুঙ্গিপাড়ার মাটির বুক থেকেও তাঁর নাম চিরতরে মুছে যায়।
কিন্তু ইতিহাসের ধ্রুব সত্য হলো, অন্যায় ও নিষ্ঠুরতা যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন, তা কখনো চিরকাল লুকিয়ে রাখা যায় না। এর মাঝেও টুঙ্গিপাড়ার তৎকালীন স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা শেখ আবদুল হালিমের বুক চিরে বেরিয়ে আসা অবিচল সাহস, অন্তরের সততা এবং তাঁর এই সুনিপুণ ও নির্মম বিবরণ চিরকালের জন্য ইতিহাসের এক অমূল্য, প্রামাণ্য ও চিরভাস্বর দলিল হয়ে আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হওয়া তাঁর সেই স্মৃতিচারণ ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুরতার ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের সামনে নতুন করে উন্মোচন করেছে।
১৫ আগস্টের মর্মান্তিক খবর রেডিওতে শোনার পর গোটা দেশ যখন স্তম্ভিত, হতভম্ব ও বিশ্বাস করতে পারছিল না, ঠিক তখনই টুঙ্গিপাড়ায় শুরু হয় দাফনের প্রস্তুতি। মাওলানা শেখ আবদুল হালিম তাঁর জবানবন্দিতে স্মৃতিচারণ করে বলেন, মর্মান্তিক সংবাদটি তিনি ১৫ আগস্ট সকালে রেডিওতে শোনেন। সমগ্র দেশবাসীর মতো তাঁরাও স্তম্ভিত ও হতভম্ব হয়ে পড়েন; মনে হয়েছিল এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। পরদিন ১৬ আগস্ট সকালে থানার ওসি মাওলানা শেখ আবদুল হালিমকে ডেকে ১৩টি কবর প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি দূরদর্শিতা ও বাস্তবতার নিরিখে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেন যে, এতগুলো কবর খুঁড়ে কী হবে—আগে তো একটি খুঁড়ি, তারপর দেখা যাবে কী হয়। সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টার দিকে কবর খোঁড়া শুরু করে তিনি ভাবেন, এখানেই হয়তো বঙ্গবন্ধুর দাফন হবে এবং তিনি যদি তাঁকে কবর দিতে পারেন তবে নিজেকে ধন্য মনে করবেন। বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক গোরস্থানে মায়ের কবরের পশ্চিমে একটু জায়গা ছেড়ে তিনি নিজ দায়িত্বে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় কবরটি প্রস্তুত করেন।
বেলা আড়াইটার দিকে হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়া ডাকবাংলোয় পৌঁছায় বঙ্গবন্ধুর কফিন। এক মেজরের নেতৃত্বে ১৩ জন সৈনিক লাশ বহন করে নিয়ে আসে। মাওলানা সাহেব এগিয়ে গেলে মেজরের সাথে তাঁর কথপোকথন ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হয়ে আছে। মেজর জানতে চান তিনি এখানকার মৌলভী কি না এবং হ্যাঁ-সূচক উত্তর পাওয়ার পর তাঁকে লাশের জানাজা পড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। মাওলানা সাহেব জিজ্ঞাসা করেন কার জানাজার ব্যবস্থা করবেন, উত্তরে মেজর জানান শেখ মুজিবের ডেড বডি। তখন মাওলানা ইংরেজিতে বলেন, “ইজ দ্য ডেড বডি অব মুজিব?” উত্তরে বলা হয়, হ্যাঁ।
উদ্দেশ্য ছিল কফিন খুলে বঙ্গবন্ধুকে নিজের চোখে দেখা, তারপর মাটি দেওয়া। কিন্তু মেজর সাহেব তাঁকে কফিনসহই জানাজা পড়ে মাটি দেওয়ার নির্দেশ দেন। মাওলানা সাহেব তাতে আপত্তি জানিয়ে ইংরেজিতে বলেন, “আই মাস্ট সি দ্য ডেড বডি।” মেজর সাহেব রেগে গিয়ে বলেন, “ডু ইউ নট বিলিভ আস?” মাওলানা অবিচল থেকে উত্তর দেন, “আই বিলিভ ইউ, বাট ওয়ান্ট টু সি ফর মাই স্যাটিসফেকশন।” শেষ পর্যন্ত মেজরের নির্দেশে সৈন্যরা কফিনের তালা খুলে দেয়।
কফিনের তালা খোলার পর মাওলানা শেখ আবদুল হালিম ও স্থানীয় মানুষেরা যে দৃশ্য দেখেন, তা বাঙালি জাতিকে আজও শোকে ও কান্নায় আচ্ছন্ন করে। তিনি খালি গায়ে পরম মমতায় ও সাহসিকতায় লাশের চারপাশ উল্টে-পাল্টে দেখেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে পৈশাচিক ও নির্মম বুলেটের ক্ষতচিহ্নগুলোর বিবরণ। বঙ্গবন্ধুর পবিত্র দেহ চালনি করে দেওয়া হয়েছিল মোট ১৮টি গুলি দিয়ে। পেটের নিচের পেছন দিক দিয়ে একটি গুলি ঢুকে সামনের তলপেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। এছাড়া আরও ৯টি গুলি বুকের নিচের দিক দিয়ে চক্রাকারে ঢুকে ভেতরেই রয়ে যায়। তবে তাঁর মুখ বা বুকে কোনো গুলির চিহ্ন ছিল না। বাম হাতের তর্জনীতে গুলি লেগে তা প্রায় ছিন্ন ও থেঁতলে গিয়েছিল। দুই বাহুর উপরিভাগে দুটি এবং ডান হাতের তালুতে একটি গুলি ছিল। দুই পায়ে ছিল চারটি গুলি, যার দুটি হাঁটুতে এবং বাকি দুটি ওপরে-নিচে। আর সবচেয়ে পৈশাচিক বিষয় হলো, তাঁর দুই পায়ের গোড়ালির রগই কেটে দেওয়া হয়েছিল। শহীদের এই নিথর দেহের পকেটেও পরম যত্নে ছিল তাঁর স্মৃতিচিহ্ন—মৃত্যুর পরেও তাঁর গায়ে থাকা পাঞ্জাবির বুকপকেটে ছিল চশমা এবং সাইড পকেটে তাঁর প্রিয় পাইপ।
ঘাতকদের নির্দেশ ছিল বিনা গোসলেই তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করার। কিন্তু মাওলানা সাহেব দ্বিমত পোষণ করে মেজরকে জানান যে, তাঁকে তো গোসল দেওয়া হয়নি; বিনা গোসলে কোনো মুসলমানের জানাজা পড়া জায়েজ নয়। মেজর সাহেব গোসলের অনুমতি দিলে মাওলানা সাহেব তড়িভড়ি করে একটি ছেলেকে টুঙ্গিপাড়া সাহেরা খাতুন হাসপাতালে পাঠান সাবান, গরম পানি ও কাফনের কাপড়ের সন্ধানে। অল্পক্ষণের মধ্যেই ছেলেটি সেখান থেকে একখানা ‘৫৭০’ সাবান এবং রেডক্রসের সৌজন্যে পাওয়া চারটি সাদা পাড়ওয়ালা শাড়ি নিয়ে ফিরে আসে। সেই কাপড় ও সাবান ব্যবহার করে পরম শ্রদ্ধার সাথে তিনি বঙ্গবন্ধুকে গোসল করিয়ে কাফন পরান এবং যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেন।
দাফনের পরেও সেই শোকাবহ টুঙ্গিপাড়ায় নেমে এসেছিল নিষ্ঠুর পুলিশি পাহারা। সরকারের পক্ষ থেকে ১০-১৫ জন পুলিশ মোতায়েন করা হয়, যারা দিবারাত্রি পালা করে কবর পাহারা দিত। পরিবারের লোকজন ছাড়া কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হতো না। এমনকি বঙ্গবন্ধুর দাফনের চার-পাঁচ দিন পর বাড়ির মসজিদে মিলাদ পড়তে চাইলে পুলিশ তাতেও বাধা দেয়। বাধ্য হয়ে কেবল বঙ্গবন্ধুর গৃহের ভেতরেই একজন মৌলভী ডেকে মিলাদ পড়ানো হয়েছিল, যদিও টুঙ্গিপাড়ার অন্যান্য মসজিদে দোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ঘাতক চক্রের নির্মম বুলেট হয়তো সেদিন টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল সেই অদম্য ও বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর, যা একটি ঘুমিয়ে থাকা জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার মহামন্ত্রে। তারা চেয়েছিল বুকঝাঝরা করা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত করে, দুই পায়ের রগ কেটে দিয়ে এবং চরম গোপনীয়তায় প্রিয় নেতাকে চিরতরে ধামাচাপা দিতে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে এই মৃত্তিকার প্রতিটি ধুলিকণায়, বাংলার প্রতিটি ঘরের প্রতিটি হৃদস্পন্দনে বেঁচে আছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। মাওলানা শেখ আবদুল হালিমের এই পবিত্র বয়ান কেবল ইতিহাসের একটি সাধারণ জবানবন্দি নয়; এটি পঁচাত্তরের সেই রক্তস্নাত কালরাত্রির এক শাশ্বত দলিল। এটি আমাদের চোখের কোণে যেমন অশ্রু আনে, তেমনই বুকভরা বেদনা ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করিয়ে দেয়—বুলেট দিয়ে একটি প্রাণ বা একটি নশ্বর দেহ কেড়ে নেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু বুলেট কখনো কোটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত জাতির পিতার নাম, আদর্শ ও ভালোবাসাকে ধুলিসাৎ করতে পারে না। টুঙ্গিপাড়ার ওই একটিমাত্র কবর আজ কেবল একটি সমাধিস্থল নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার অবিনশ্বর শিখা এবং মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার চিরন্তন প্রেরণা।
লেখক- মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au