২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা: ২২ বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় ভুক্তভোগীরা
মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ২২ বছর পরও নিহতদের স্বজন ও হামলায় আহতরা প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের…
মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট: ২০০৪ সালের ওই বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করেছেন। নেতা-কর্মীরা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ গোটা এলাকা কাঁপিয়ে দেয়।
কয়েক মিনিট আগেও যেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য, স্লোগান ও মানুষের কোলাহল ছিল, মুহূর্তের মধ্যে সেখানে শোনা যায় আহত মানুষের আর্তনাদ। ধোঁয়ার মধ্যে মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে, রাস্তায় পড়ে আছে ক্ষতবিক্ষত দেহ। যে যেভাবে পারছেন, আহত ব্যক্তিদের রিকশা, মোটরসাইকেল কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু প্রকাশ্য দিবালোকে একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমাবেশে সামরিক মানের গ্রেনেড ব্যবহার করে এমন সুসংগঠিত হামলা দেশের মানুষ আগে দেখেনি। হামলার ধরন, সময় এবং লক্ষ্য—সবকিছু মিলিয়ে এটি নিছক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল বলে মনে করার সুযোগ তখনো ছিল না, আজও নেই।
পরদিন দেশের সংবাদপত্রগুলো সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য মানুষের সামনে তুলে ধরে। প্রথম আলো প্রথম ও শেষ পাতাজুড়ে প্রকাশ করে হামলার সংবাদ, হতাহত ব্যক্তিদের ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য মানুষের অসহায় ছোটাছুটির বিবরণ। পরবর্তী কয়েক দিনেও পত্রিকাটি আহতদের অবস্থা, আইভি রহমানের চিকিৎসা, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
দ্য ডেইলি স্টার তার প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম দিয়েছিল—“Assassination Attempt on Hasina” বা ‘শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা’। পত্রিকাটি লিখেছিল, শেখ হাসিনাই ছিলেন হামলার দৃশ্যমান লক্ষ্য। নেতা-কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির শিরোনাম ছিল—“Blasts hit Bangladesh party rally”।
প্রথম দিনের সংবাদে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য ছিল। কোনো পত্রিকা ১৬ জন, কোনো সংবাদমাধ্যম ১৯ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। সেটিই স্বাভাবিক ছিল। তখনো আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল, অনেকের পরিচয় জানা যায়নি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমে বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত আইভি রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েক শ মানুষ। তাঁদের অনেককে পরবর্তী জীবন কাটাতে হয়েছে শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার এবং মনে ভয়াবহ স্মৃতি বহন করে।
সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলো কেবল মৃত্যুর সংখ্যা জানায়নি; তারা কিছু মৌলিক প্রশ্নও তুলেছিল। এত বড় রাজনৈতিক সমাবেশের নিরাপত্তা এত দুর্বল ছিল কেন? হামলাকারীরা সামরিক মানের গ্রেনেড পেল কোথায়? হামলার পর ঘটনাস্থল যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে দ্রুত ধুয়ে ফেলা হয়েছিল কেন? অবিস্ফোরিত গ্রেনেড ও অন্যান্য আলামত কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছিল? আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া মানুষের ওপর পুলিশ কেন লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছিল? হামলাকারীরা কীভাবে নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পারল?
দুই দশকের বেশি সময় পরও এই প্রশ্নগুলো পড়লে মনে হয়, সংবাদপত্রের পুরোনো পাতা যেন বর্তমানের কাছেই জবাব চাইছে।
একটি হামলার সত্য উদ্ঘাটনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো ঘটনার অব্যবহিত পরের কয়েক ঘণ্টা। ঘটনাস্থল সুরক্ষিত রাখা, আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া এবং সম্ভাব্য হামলাকারীদের পালানোর পথ বন্ধ করা—এসবই তদন্তের প্রাথমিক শর্ত। ২১ আগস্টের ঘটনায় শুরু থেকেই এসব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। পরবর্তী তদন্ত এবং বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ কাহিনি মানুষের আস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিচারিক প্রক্রিয়াও দীর্ঘ ও নাটকীয় পথ পাড়ি দিয়েছে। ২০১৮ সালে বিচারিক আদালত বিভিন্ন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন এবং অন্যান্য মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে দণ্ডিত সব আসামিকে খালাস দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
কিন্তু সব অভিযুক্তের খালাসের পর একটি মৌলিক প্রশ্ন আরও প্রবল হয়ে সামনে আসে—তাহলে এত মানুষের হত্যার জন্য দায়ী কারা?
চব্বিশটি প্রাণ হারিয়ে গেল। কয়েক শ মানুষ আহত হলেন। একটি দেশের বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রকাশ্য সমাবেশে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হলো। অথচ এত বছর পরও অপরাধীদের পরিচয় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো না।
২১ আগস্টকে শুধুই আওয়ামী লীগের শোকের দিন হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ইতিহাসের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হামলাটি হয়েছিল আওয়ামী লীগের সমাবেশে এবং প্রধান লক্ষ্য ছিলেন দলটির তৎকালীন সভাপতি শেখ হাসিনা—এটি ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু এর আঘাত পড়েছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর।
সেদিনের সংবাদপত্রের সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে আতঙ্কিত মানুষের মুখ, রক্তাক্ত রাজপথ, আহত ব্যক্তিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি মানবঢাল। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে উঠে আসে বিস্ফোরণের শব্দ, ধোঁয়া, গুলির আওয়াজ এবং মানুষের বাঁচার আকুতি। সেই প্রতিবেদনগুলো সম্মিলিতভাবে একটি সত্য প্রতিষ্ঠা করে—সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ভয়াবহ, পরিকল্পিত এবং নজিরবিহীন রাজনৈতিক সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল।
পুরোনো সংবাদপত্রের পাতায় জমে থাকা রক্তের দাগ হয়তো এখন আর দৃশ্যমান নয়। কাগজের রং বিবর্ণ হয়েছে, ছবিগুলোও ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিন্তু সেসব পাতায় লেখা প্রশ্নগুলো এখনো তীক্ষ্ণ।
কারা পরিকল্পনা করেছিল এই হামলা? কারা গ্রেনেড ছুড়েছিল? কারা তাদের পালাতে সাহায্য করেছিল? অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি বর্তমান সরকারের প্রধান না হয়ে থাকেন, সত্যিই এই হামলার সঙ্গে জড়িত না হয়ে থাকেন, তবে বর্তমান সরকারের শীর্ষ দায়িত্বে থেকে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং জাতির সামনে সত্য প্রকাশে তিনি কি কার্যকর উদ্যোগ নেবেন?
এই প্রশ্নটি রেখে দিলাম।
সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au