শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন: গৌরব, বিতর্ক ও ট্র্যাজেডির পাঠ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র জাতির কাছে প্রধান নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের সব রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন দোষে-গুণে মানুষ…
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হত্যার সময়, হত্যার কারণ, মরদেহের অবস্থান এবং ময়নাতদন্তের তথ্য নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের পার্থক্য দেখা দেওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে মামলাটির তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের দিন ভোরে গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ দুই যুবক ছাদ থেকে টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন দৃশ্য কয়েকজন প্রতিবেশী দেখেছেন বলে দাবি উঠেছে। তবে ওই প্রতিবেশীদের কেউই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইছেন না। ফলে তারা ঠিক কী দেখেছেন এবং সেই তথ্য তদন্তে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
আগামী চক্রবর্তীর বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ভোরে বাড়ির ছাদের দিকে অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখতে পান আশপাশের কয়েকজন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দুই যুবককে একটি মরদেহ টেনে ছাদের ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানা গেছে। তবে ঘুমের ঘোরে থাকায় তারা পুরো বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেননি বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে প্রতিবেশীরা এসব তথ্য পুলিশকে দিয়ে সহায়তা করছেন না। এক অজানা আতঙ্কে চুপ করে আছেন।
এ ছাড়া ঘটনার সময় একজন নারী স্থানীয়ভাবে চিৎকার বা অস্বাভাবিক শব্দ শুনেছিলেন বলে পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন। পরে ওই নারীকে তাঁর স্বামী মারধর করে বিষয়টি নিয়ে আর কথা না বলার জন্য চাপ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্তে পুলিশও পেয়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার।
বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে প্রথমে ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে তাঁদের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে টেনে নিয়ে রাখা হয়। এরপর নিচতলায় গিয়ে ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়।
এই তথ্যের সঙ্গে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ ছাদ থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখার দাবিটির একটি মিল পাওয়া গেলেও, কে বা কারা মরদেহটি টেনে নিয়ে গিয়েছিল, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
গত শনিবার রাতে কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী এবং ছেলে আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রতিবেশী দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার ভোরে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের দেখে ফেললে তর্কাতর্কি হয়। পরে নিজেদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তাঁরা। শব্দ পেয়ে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে গেলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। পরে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ছেলে আয়ুশকে হত্যা করা হয়।

মুগ্ধ-সিদ্ধার্থই হত্যাকারী, ছাদে হত্যা করা হয় তিনজনকে: পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা। তাঁদের প্রশ্ন, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পরও অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করলেন, গোসল করলেন কিংবা বাড়ির ভেতরে অবস্থান করলেন, এমন ঘটনা কতটা স্বাভাবিক। তাঁরা ঘটনার পেছনে আরও কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যেও পার্থক্য দেখা গেছে। পুলিশ নিহত আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে যাওয়া ও চোখ বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল। তবে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তে তাঁর চোয়াল ভাঙা বা চোখ বের হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসক জানান, আগামী চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। চারজনের শরীর বা মুখে অ্যাসিড কিংবা কোনো রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে পোড়ানোর আলামতও ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের প্রাথমিক ধারণায় নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত এবং সেখানে তরল পদার্থ পাওয়ায় অ্যাসিড বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের সন্দেহ করা হয়েছিল। পরে ময়নাতদন্তে এ ধরনের আলামত না পাওয়ায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।
এদিকে বুধবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের পানি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, এতে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে পুলিশ বলেছে, প্রয়োজনীয় আলামত আগেই সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পানি দেওয়ার ঘটনায় তদন্তে কোনো সমস্যা হবে না।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের জবানবন্দিতে ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন, গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটি এবং পরে চারজনকে হত্যার বর্ণনা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, ঘটনার আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাঁদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করেন। পরে মাদক ব্যবসায়ী শান্তর কাছ থেকে আরও ইয়াবা সংগ্রহ করে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের দেখে ফেলায় প্রথমে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। এরপর বাড়ির ভেতরে থাকা আয়ুশ সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও মাদক গ্রহণের পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্য, আসামিদের জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

রংপুরে একসঙ্গে হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতিছবি: সংগৃহীত
তবে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে সাংবাদিকদের করা বেশ কিছু প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাংবাদিকরা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবিতে রংপুরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদ ও মহানগর নাগরিক কমিটিও মানববন্ধন করেছে। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
মামলাটির তদন্তভার ইতোমধ্যে কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে ডিবির কাছে দেওয়া হয়েছে। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au